আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করতে কাজ করছে সরকার। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট-২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ, উচ্চগতির ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আধুনিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনগণের প্রাইভেসি সুরক্ষিত থাকে। এতে জনগণ তথ্যপ্রযুক্তির ওপর বিশ্বাস হারাবেন না। বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন এবং বিশেষ করে হুয়াওয়ের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দেশে প্রযুক্তির প্রসারে হুয়াওয়ের অবদান রয়েছে।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, টেকসই নীতিমালার আলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো গেলে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। এআইভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা গেলে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে পরিচালন ব্যয় কমে আসবে। এতে লাভবান হবে দেশের জনগণ। তবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তির অবকাঠামো তৈরি এবং সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এআই নীতিমালা চূড়ান্তের আশা
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে সরকার পাঁচটি কৌশল নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব আইন প্রণয়ন, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা এবং দেশীয় উৎপাদন।
তিনি জানান, একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এটি সম্পন্ন করার আশা করা হচ্ছে। নাগরিকদের একক নম্বর বা আইডির মাধ্যমে সেবা দিতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য ‘ওয়ান সিটিজেন-ওয়ান ওয়ালেট’ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ সচিব ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, নতুন নতুন প্রযুক্তির যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটির অবশ্যই একটি মূল্য থাকতে হবে, যাতে জনগণ উপকৃত হয়। নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং সমৃদ্ধ, বিনিয়োগনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
শিল্প ও জ্বালানি খাতে এআই ব্যবহারে ব্যয় কমবে
হুয়াওয়ের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে হুয়াওয়ে সরকার এবং শিল্পখাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন সেবা উদ্ভাবন এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
হুয়াওয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, এ দেশে শিল্প ও জ্বালানি খাতে এআই ব্যবহার করা গেলে পরিচালন ব্যয় অনেক কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে হুয়াওয়ে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে পারে।
সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইদা আফরোজ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের ৯৯ শতাংশ এখন ফোর-জি প্রযুক্তির আওতায়। কিন্তু ফোর-জি সমর্থিত মোবাইল ডিভাইস রয়েছে মাত্র ৪৬ শতাংশ গ্রাহকের। এ কারণে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারছেন না। এ সময় তিনি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
ফাইভ-জি ও ডিজিটাল সংযোগ নিয়ে আলোচনা
সম্মেলনে ‘ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’, ‘শিল্পখাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক তিনটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় ফাইভ-জি ও সংযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পখাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তৈরি পোশাকশিল্প, বন্দর, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ফাইভ-জি, ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস (এফডব্লিউএ) এবং এন্টারপ্রাইজ কানেক্টিভিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ বলেন, নীতি ও প্রযুক্তির অবকাঠামো হতে হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী। অর্থাৎ জনসংখ্যা ও আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে হবে।
রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ১৫ বছর আগে অবকাঠামো ভাগাভাগি বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং গাইডলাইন তৈরি হলেও গত ১৫ বছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। দ্বিতীয়ত, দেশে প্রতিযোগিতা আইন রয়েছে। কিন্তু এই আইন প্রয়োগে সরকারের শক্ত ভূমিকা দেখা যায় না। এ কারণে গ্রাহকরা যৌক্তিক সেবা পাচ্ছেন না।
আলোচনায় সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওশিন পর্ণিনী এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান। প্যানেলিস্ট হিসেবে টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং প্রযুক্তিশিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
আলোচনায় ক্লাউড কম্পিউটিং, অটোমেশন, এআইভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। ব্যাংকিং, উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ এবং সরকারি সেবায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়েও আলোচনা করেন বক্তারা।
তারা বলেন, এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য ক্লাউড অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রস্তুতি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সহায়ক নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ।
এআইভিত্তিক স্মার্ট স্কুলের মডেল প্রদর্শন
সম্মেলনে এআইনির্ভর সেবা খাতের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ছিল প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার একটি স্মার্ট স্কুলের মডেল। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভালো স্কুলে পড়তে পাঁচ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। দূরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
হুয়াওয়ের কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থীরা টাঙ্গাইল বা রাজশাহীর যেখানেই থাকুক, বড় পর্দার মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্লাস করতে পারবে। এ জন্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী এই প্রযুক্তি শ্রেণিকক্ষ সাজাতেও সক্ষম হবে।
সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি প্রদর্শন
সবুজ জ্বালানি নিয়েও একটি স্টলে প্রদর্শনীর আয়োজন করে হুয়াওয়ে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার এমডি ইশতিয়াক আহমেদ যুগান্তরকে জানান, লোডশেডিংমুক্ত দেশ গড়তে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণে হুয়াওয়ে বাংলাদেশের জন্য সৌর প্যানেলের স্মার্ট কনভার্টার ও লিথিয়াম ব্যাটারি স্টোরেজ নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, এই ব্যাটারি স্টোরেজে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি গ্রিডের বিদ্যুৎও সংরক্ষণ করা যাবে। এতে করে এই ব্যাটারি পাওয়ার সিস্টেম মাত্র সাড়ে চার বছরে বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে পারবে। তিনি আরও বলেন, সৌর প্যানেলে হুয়াওয়ের ইনভার্টার ব্যবহার করলে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে না। আগুন লাগলে নিজে থেকেই পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাবে।
স্মার্ট কানেকশন হাউসে রোবট ও এআই প্রযুক্তি
‘স্মার্ট কানেকশন হাউস’ নামে একটি স্টলে এআই প্রযুক্তি ও রোবটের মাধ্যমে আধুনিক জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে হুয়াওয়ে। সেখানে কৃত্রিম বিড়ালসহ বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম প্রাণীর মডেলও প্রদর্শন করা হয়।
সম্মেলনে প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নিরাপদ ইন্টারনেট ও এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। এ জন্য সাইবার নিরাপত্তার ভিত্তি আরও মজবুত করার বিকল্প নেই বলে জানান তারা।