কাউনিয়ার চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়িতে কৃষিপণ্য পরিবহন, জীবিকা চলছে ৪ শতাধিক পরিবারের
কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত ২২টি চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ বাহন হয়ে উঠেছে ঘোড়ার গাড়ি। বালুময় পথ, কাদামাটির রাস্তা ও শুকিয়ে যাওয়া নদীর শাখা-প্রশাখা পেরিয়ে কৃষকের উৎপাদিত ফসল হাটবাজারে পৌঁছে দিচ্ছে এই বাহন। এতে একদিকে সহজ হচ্ছে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, অন্যদিকে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন চার শতাধিক পরিবারের সদস্য।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় ধান, পাট, আলু, বাদাম, ভুট্টা, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচ ও কুমড়াসহ নানা ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। তবে কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এখানকার কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক এলাকায় ভ্যান, রিকশা, ট্রলি কিংবা ট্রাক চলাচল করতে না পারায় উৎপাদিত ফসল পরিবহনে দুর্ভোগ পোহাতে হয় কৃষকদের।
একসময় পরিবহনসংকটের কারণে জমি থেকে ফসল সংগ্রহের পর অনেক কৃষক স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম দামে তা বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। বর্তমানে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার বাড়ায় কৃষকেরা তুলনামূলক সহজে ফসল হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারছেন। ফলে সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের কাছে ঘোড়ার গাড়ি ‘চরের বাহন’ হিসেবে পরিচিত। দুর্গম ও বালুময় পথে চলাচলের উপযোগী হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহনে এ বাহনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিশেষ করে রবি মৌসুমে আলু, বাদাম, ভুট্টা, কুমড়া ও অন্যান্য ফসল পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা বেশি থাকে।
উপজেলার ঢুসমারা চরের ঘোড়ার গাড়িচালক আবদুল করিম মণ্ডল বলেন, শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে রবি ফসলের মৌসুমে তাঁর আয় বেশি হয়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা আয় করেন তিনি। তবে কাজের পরিমাণ ও মৌসুমের ওপর আয়ের তারতম্য হয়।
তিনি বলেন, “চরের রাস্তায় অন্য যানবাহন সহজে চলতে পারে না। ঘোড়ার গাড়িতে কৃষকের ফসল হাটে পৌঁছে দেওয়া যায়। এতে কৃষকের সুবিধা হচ্ছে, আবার আমাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। এই গাড়ি চালিয়েই সংসার চালাচ্ছি।”
হারাগাছ ইউনিয়নের চর নাজিরদহ গ্রামের ঘোড়ার গাড়িচালক আবদুল খালেক বলেন, চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বাড়ায় তাঁর আয়ও বেড়েছে। ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে উপার্জিত অর্থ তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আরাজি হরিশ্বর গ্রামের কৃষক দরদি বলেন, “ঘোড়ার গাড়ির কারণে এখন চর থেকে ফসল হাটে নিয়ে বিক্রি করতে পারছি। আগে পরিবহনের সমস্যায় অনেক সময় কম দামে ফসল বিক্রি করতে হতো। এখন নিজেরাই পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী, টেপামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম, শহীদবাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান এবং হারাগাছ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজু আহমদ জানান, ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ আর আল মামুন বলেন, ঘোড়া চরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের উপযোগী একটি প্রাণী। তবে ঘোড়ার সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা, পর্যাপ্ত খাবার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে চরাঞ্চলের কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছেন। দুর্গম এলাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে এ বাহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কাউনিয়ার চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সহজে ও কম খরচে বাজারে পৌঁছাতে সারা বছর চলাচল উপযোগী রাস্তা নির্মাণ এবং পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি ঘোড়ার গাড়িচালকদের নিরাপত্তা এবং ঘোড়ার স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করাও জরুরি।
দুর্গম চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ি তাই শুধু কৃষিপণ্য পরিবহনের বাহন নয়, এটি শত শত মানুষের জীবিকা নির্বাহেরও অন্যতম অবলম্বন।
