কালবেলা · আন্তর্জাতিক
ব্রাজিলে লুলার জয়ে লাতিন আমেরিকা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ধাক্কা
10/27/2026

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জয়ে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনায় ধাক্কা খেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনি বিজয়ের ভাষণে লুলা বলেছেন, ‘ব্রাজিল কারও বাড়ির উঠান হয়ে থাকতে রাজি নয়।’ তার এ বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া।
নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত প্রধান নির্ধারক না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার অবস্থান ভোটের প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। সাবেক শ্রমিকনেতা হিসেবে ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তার রয়েছে, এ অবস্থান তারই প্রতিফলন।
লুলার বিজয়ের পর ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি লুলাকে পছন্দ করি, আমাদের সম্পর্ক ভালো।’ তবে একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনকে ভয়াবহ ও কারচুপিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। ট্রাম্প সরাসরি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে সমর্থন করেননি। তবে ফ্লাভিওর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন ট্রাম্প।
এর আগে ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার বিচারকে কেন্দ্র করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। লুলা তখন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে সরব হন এবং ‘ব্রাজিল ব্রাজিলিয়ানদের’ লেখা নীল টুপি পরে প্রচারে অংশ নেন। তার জনপ্রিয়তাও বাড়ে। পরে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমালেও তা আবার বেড়েছে।
লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের হিসাব
লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ নেতারা ক্ষমতায় এসেছেন। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুতে ডানপন্থি বা ট্রাম্পঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের উত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। ট্রাম্পের এ কৌশল ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিত।
যুক্তরাজ্যের চ্যাথাম হাউসের লাতিন আমেরিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, ফ্লাভিও বলসোনারো প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিলকে নিজেদের দশম ও সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছিলেন ট্রাম্পপন্থিরা।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশ ব্রাজিল। দেশটিতে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়। মাদক পাচারবিরোধী ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ জোটেও ব্রাজিলকে যুক্ত করার প্রত্যাশা ছিল।
নতুন করে বাড়তে পারে দ্বন্দ্ব
সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও লুলার আগামী চার বছরের মেয়াদে দুই দেশের মধ্যে আবার উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা নিয়ে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল ব্রাসিলিয়া। দুই মার্কিন কর্মকর্তার ভিসা বাতিলের পর যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা এবং সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের নৌযানে মার্কিন হামলাসহ লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন লুলা।
প্রযুক্তি ও বাণিজ্য নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। লুলার প্রচারশিবির অভিযোগ করেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে কাজ করছে। মেটা অভিযোগ অস্বীকার করলেও কিছু পোস্ট ভুলভাবে সরানো বা সেগুলোর প্রচার সীমিত করার মতো কারিগরি ত্রুটির কথা স্বীকার করে। অন্যদিকে, ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়ে অসন্তুষ্ট ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, এ ব্যবস্থা ভিসা ও মাস্টারকার্ডের ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে।
তবে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি অবনতির দিকে যাচ্ছে, এমনটা বলার সুযোগ নেই। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। আপাতত দুই নেতার সম্পর্কও কার্যকর রয়েছে। ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কতটা হস্তক্ষেপ করে এবং লুলা তার জবাবে কতটা কঠোর অবস্থান নেন, তার ওপর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ভর করবে।
সূত্র : বিবিসি
মূল প্রতিবেদনে যান ↗