ভারত সরকারের নতুন গোপনীয়তা আইন (প্রাইভেসি ল) নিয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু করেছে। মিডিয়া গ্রুপগুলোর দাবি, এই আইনের কারণে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করা অসম্ভব হবে এবং অনেক সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ভারত সরকারের এই আইনের একটি নিয়ম হল, সাংবাদিকরা যদি কারও বিষয়ে কোনো খবর বা প্রতিবেদন লিখতে চান, তবে লেখার আগে সেই ব্যক্তির অনুমতি বা সম্মতি নিতে হবে।
সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এই অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাকে ‘পূর্ব-সেন্সরশিপ’ আখ্যা দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রাইভেসি ল এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে বড় বড় সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়া গ্রুপ।
তাদের বক্তব্য হল-কোনও অপরাধী বা দুর্নীতিবাজ কখনও তার বিরুদ্ধে খবর লেখার অনুমতি দেবে না। ফলে খবর প্রকাশের আগেই তা আটকে যাবে। এটি এক ধরণের পূর্ব-সেন্সরশিপ।
মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতে শুনানি চলাকালে সংবাদ মাধ্যমগুলো সতর্ক করে বলেছে, এই আইন কার্যকর হলে স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে না পারায় দেশের বহু সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ভারতের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে দেশটিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ চলে আসছে। তবে মোদী সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।
সোমবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ ২১টি সংবাদ প্রকাশনা সংস্থার একটি গ্রুপ এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেছে।
তাদের দাবি, আইনটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং সরকারের হাতে সাংবাদিকদের তথ্যের গোপন উৎস জানার সুযোগ করে দেবে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় এবং বৃহৎ মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর ডিজিটাল প্রকাশকদের সম্মিলিত সংগঠন ‘ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (ডিএনপিএ)- এর পক্ষে আইনজীবী মাধবী গোরাডিয়া দিভান বিচারকদের বলেন, “এই আইন খবরের মূল ধারণাই বদলে দিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের যদি সংবাদের জন্য অনুমতি নিতে হয়, তবে সংবাদ কক্ষগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এটি পুরোপুরি এক ধরনের পূর্ব-সেন্সরশিপের ব্যবস্থা।”
দিভান আদালতকে জানান, আইনের আগের খসড়াগুলোতে সাংবাদিকদের জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত সংস্করণে তা বাদ দেওয়া হয়েছে।
এত দিন শুধু বাকস্বাধীনতাবিষয়ক কর্মী ও কিছু ছোট সংবাদমাধ্যম আইনটির বিরোধিতা করে আসছিল। তবে এবারই প্রথম দেশের শীর্ষ মিডিয়া হাউজগুলো একযোগে মোদী সরকারের বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়াল।
সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি আগামী মাসের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছে। চলতি মাসের শুরুতে আদালতে জমা দেওয়া নথিতে প্রকাশকরা জানান, গত অগাস্টে সরকারের সঙ্গে এক বৈঠকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো এই আইনে সাংবাদিকদের জন্য কোনও লিখিত সুনির্দিষ্ট ছাড় রাখা হয়নি। বিষয়টি প্রকাশকদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানাচ্ছে প্রকাশকদের সংগঠন।
তাদের আশঙ্কা, এই আইন প্রকাশকদের পুরোনো খবর মুছে ফেলতে বাধ্য করতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের গোপন উৎস তলব করার ক্ষমতা চলে যাবে সরকারের হাতে।
ভারতের মোদী সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা ‘ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (ডিএনপিএ)- এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির ‘নেটওয়ার্ক১৮’, আদানির ‘এনডিটিভি’, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ এবং ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘টাইমস ইন্টারনেট’।
