দীর্ঘ ১০ মাসের বেশি সময় নির্বাসনে থাকার পর নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তার এই প্রত্যাবর্তনকে দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশে ফিরে সমর্থকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন তিনি। তবে তার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাচাদো লেখেন, ‘আমি এখানে, আপনাদের সঙ্গে।’ এর আগে কয়েকবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। এবার তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে।
রবিবার ভেনেজুয়েলার লারা রাজ্যের একটি গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেন মাচাদো। এ সময় সমর্থকেরা তাকে ঘিরে ধরেন, আলিঙ্গন করেন এবং হাত ধরে স্বাগত জানান। পরে সমর্থকদের উল্লাসের মধ্য দিয়ে গাড়িবহর নিয়ে রাজধানী কারাকাসের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। রাজধানীতে প্রবেশের সময় গাড়ির ছাদ দিয়ে মাথা বের করে হাসিমুখে সমর্থকদের অভিবাদন জানান মাচাদো।
এক্সে দেওয়া আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের কারাকাসে পুনর্মিলনের রাত। প্রতিটি পরিবারের পুনর্মিলন, প্রত্যেক রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি এবং ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতার জন্য।’
মাচাদোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এদমুন্দো গঞ্জালেসও তার দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমাদের নেত্রী, আমার প্রিয় মারিয়া কোরিনা, ভেনেজুয়েলার মাটিতে ফিরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলাবাসীর জন্য দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাচাদোর প্রত্যাবর্তন দেশটির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। দেশকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিতে শিগগিরই মাচাদোর সঙ্গে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন গঞ্জালেস।
মাচাদোর উপদেষ্টা গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিলেন, এর আগের কয়েক সপ্তাহে তিনি সাতবার ভেনেজুয়েলায় ফেরার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই বাধার মুখে পড়েন। তার দেশে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মাচাদো এখন দেশে ফিরে কী পদক্ষেপ নেবেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে এর আগে তিনি বলেছিলেন, নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি আবারও প্রার্থী হবেন। তার দেশে ফেরার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে মনে করা হচ্ছিল।
গণতন্ত্রের জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত মাচাদো ২০২৩ সালে ভেনেজুয়েলার সরকারি নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বাইরে আয়োজিত বিরোধীদের প্রাথমিক নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকার তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও কর ফাঁকির অভিযোগ তুলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখে। মাচাদো অভিযোগগুলো অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন।
দেশ ছাড়ার আগে শেষ কয়েক দিন তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে ছিলেন। পরে নরওয়েতে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করতে স্পিডবোটে করে গোপনে ভেনেজুয়েলা ছাড়েন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাচাদোর পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তার মিত্র গঞ্জালেস। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ নির্বাচন কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত ভোটের হিসাব প্রকাশ না করেই মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। অন্যদিকে, বিরোধীরা দাবি করে, নির্বাচনে গঞ্জালেস জয়ী হয়েছেন। নিজেদের দাবির পক্ষে ভোটের হিসাবের অনুলিপিও প্রকাশ করে তারা।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে সরিয়ে নেয়। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে কারাবন্দি রয়েছেন। মাদক, অস্ত্র ও নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগে তার বিচার চলছে। তবে এসব অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন মাদুরো।
মাদুরোকে সরিয়ে নেওয়ার পর তার ডেপুটি ডেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। পরে তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি তেল চুক্তিও সই করেন তিনি, যাতে মার্কিন পক্ষের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক শর্ত রাখা হয়।
মাচাদোর মুখপাত্র ডেভিড স্মোলানস্কি তার দেশে ফেরাকে ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং অদূর ভবিষ্যতে অবাধ, সুষ্ঠু ও যাচাইযোগ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন।
একই সঙ্গে মাচাদোর মুখপাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মার্কিন সরকার, কংগ্রেস এবং মিত্র দেশগুলোর সরকারকে অব্যাহত নেতৃত্ব ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান।
রবিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে তার নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, তিনি খুব ভালো একজন নারী। তিনি আমাকে তার নোবেল পুরস্কার দিয়েছেন, তাই তাকে নিয়ে আমি আর কী বলতে পারি? আমি আশা করি, তিনি নিরাপদে আছেন।’
গত জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দিয়েছিলেন মাচাদো। তবে নোবেল পুরস্কার প্রদানকারী কমিটি তখন জানিয়েছিল, এই পুরস্কার প্রত্যাহার, ভাগাভাগি বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না।
অন্যদিকে, মাচাদোর নিরাপদে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চলা রাজনৈতিক সমঝোতা আলোচনার ফলেই মাচাদোর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এসব আলোচনার মাধ্যমে ইতিমধ্যে শত শত রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি পেয়েছেন এবং বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছেন।
রুবিও আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সব রাজনৈতিক পক্ষ এই আলোচনাকে সমর্থন করবে। গত ৩০ বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং একটি স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এটিই সবচেয়ে ভালো সুযোগ।’
সূত্র: বিবিসি
