প্রথম আলো
‘হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হামের টিকা দেওয়ার পরও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) গড়ে ওঠেনি। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে না ওঠার এমন প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা ও টিকাদানব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।
সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা বলছেন, হাম–রুবেলার জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনের পর দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শরীরে হাম প্রতিরোধ পরিস্থিতি জানতে প্রথমবারের মতো এই গবেষণা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর; রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক ও ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা গবেষণাটি করেছেন। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছে আইইডিসিআর। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে প্রথম আলো গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে।
এ বছর মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগ ২০ এপ্রিল দেশজুড়ে হাম–রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে। ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। এর আগে এপ্রিল মাস থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা বলেন যে ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার তিন থেকে চার সপ্তাহের পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। যদিও ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পরও হামের সংক্রমণ থামেনি।
এই পরিস্থিতিতে হামের টিকা শিশুদের শরীরে কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলছে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় টিকা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা টিকার কার্যকারিতা নিয়ে একটি গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলে আসছেন।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
আইডিসিআরের নেতৃত্বে নতুন গবেষণাটি হয়েছে জাতীয় হাম–রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি উপশহর ও গ্রাম এলাকার ৩০৯টি শিশুকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব শিশুর বয়স ছিল ৯ থেকে ৫৯ মাস। শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, গবেষকেরা তা নিশ্চিত হন টিকা কার্ড দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। এদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, ৩০৯টি শিশুর মধ্যে ২০৩টির বা ৬৫.৭ শতাংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি সীমান্ত এলাকায় (বর্ডার লাইন)।
স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫টির শরীরে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি।
গবেষকেরা বলছেন, এক ডোজ টিকায় যত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে, দুই বা তিন ডোজ টিকায় তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা গড়ে ওঠে। কিন্তু হামের সংক্রমণ বা বিস্তার থামানোর জন্য যতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা দরকার, তার চেয়ে অনেক কম রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শিশুদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
ঝুঁকি কোথায়
টিকাবিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়সের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্কিত। ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০টির মধ্যে ৫০টির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০টির মধ্যে ৮৫টির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। আবার ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে।
কিন্তু আইইডিসিআরের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা শিশুর হার অনেক কম। কেন এমন হলো? টিকা–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) যত টিকা ব্যবহৃত হয়, তার সবই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। এই টিকার মান যাচাই করা হয় না। মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই। ধরেই নেওয়া হয় টিকার মানে কোনো ঘাটতি নেই।
টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকার কার্যকারিতা নষ্ট বা হ্রাস পেতে পারে একাধিক কারণে। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় এবং পরিবহন করতে হয়। এটা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর কোনো একটি পর্যায়ে তাপমাত্রার হেরফের হতে পারে। তাতে টিকার মান পড়ে যেতে পারে।’
তাজুল এ বারি আরও বলেন, শিশু যদি অতিমাত্রায় অপুষ্টির শিকার হয়, তাহলে তার শরীরে টিকা কম কার্যকর হয়। অন্যদিকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুর শরীরে হামের টিকা বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, ‘ঠিক কোন কারণে টিকা কার্যকর হচ্ছে না, তা অনুসন্ধান জরুরি।’
পরিস্থিতি জটিল
৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে। তাতে বলা হয়, ইপিআইয়ের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে।
ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, টিকার ব্যাপারে অন্ধ থাকা উচিত নয়। শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা দিতে হবে। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে টিকার কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।
এখন আইইডিসিআরের গবেষণায় টিকা দেওয়ার পরও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠতে দেখা যায়নি। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক শিশু হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এসব শিশুর বয়স বাড়ছে, তারা টিকার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
গতকাল সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, বহু দেশে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।’ আইইডিসিআরের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি খুব ছোট গবেষণা, নমুনা কম। এই গবেষণার ফলাফল থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। আরও বড় গবেষণা দরকার।’
পরিস্থিতি জানতে ও বুঝতে আরও বড় ধরনের গবেষণা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে একটি গবেষণা হচ্ছে। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
হামে মৃত্যু থামছে না
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এ বছর হামে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৩৩ জনের। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের।
এই পরিস্থিতিতে টিকার কাভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপর নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা দেওয়ার বয়সসীমাও বাড়াতে হবে। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। একপর্যায়ে তা ১৮ বছর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করতে হবে। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।’
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘স্থানীয় সরকারে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি’। খবরে বলা হয়, স্থানীয় সরকার খাতে গত ১৭ বছরে ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে সরকারি তদন্তে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৬টি খাতে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
এদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুদক অনুসন্ধান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগ আমল ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষদিন পর্যন্ত এই তদন্ত আওতাভুক্ত করা হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল যুক্ত করে বিগত ১৭ বছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানে গত ১২ মে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের মহাপরিচালককে। সদস্য সচিব ছিলেন-স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব মো. সামছুল ইসলাম। অন্য সদস্যরা হলেন-জেলা পরিষদ শাখার উপসচিব খোন্দকার ফরহাদ আহমদ, সিটি করপোরেশন-১ শাখার উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম, পাস-৩ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. আকতারুন নেছা, প্রশাসন-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব তাহমিনা আক্তার এবং উন্নয়ন-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব এবিএম আরিফুল ইসলাম। গঠিত কমিটি স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তর-সংস্থার অভিযোগপত্র, প্রকল্পের অডিট প্রতিবেদন, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের অডিট রিপোর্ট, সংশ্লিষ্ট নথি, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে। কমিটির সভা ২০২৬ সালের ৪ জুন, ১৮ জুন, ২৯ জুন, ১ জুলাই, ১৬ জুলাই, ৩০ জুলাই, ১৮ আগস্ট এবং পরবর্তী কয়েকটি তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। ৫ অক্টোবর সচিবের সভাপতিত্বে প্রতিবেদন পর্যালোচনা সভাও হয়। গত ১৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা-৩ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি অধিকতর নিরপেক্ষ, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সমন্বিত তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে, ৬৬টি খাত নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কোথাও প্রকল্পের অর্থের ব্যবহার, কোথাও ভ্যাট-কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, কোথাও নির্মাণ কাজের মান যাচাই না করে বিল পরিশোধ, আবার কোথাও নিয়োগ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি বা অনিয়মের অঙ্ক উল্লেখ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অধিকতর তদন্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পিরোজপুরে এলজিইডির প্রকল্পে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি: পিরোজপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের বিভিন্ন অর্থবছরের উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প সমাপ্তির তারিখে মালামাল ও মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি যাচাই, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, গাড়ি কেনা ও মেরামত, অনুমোদিত জনবলের বাইরে বেতন-ভাতা এবং সড়ক-কালভার্ট নির্মাণে অনিয়মের পৃথক বিষয়ে দুর্নীতির কথাও বলা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও তিনটি মোটরযান-সংক্রান্ত বিষয়ে ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, গাড়ি মেরামতের অর্থ চালকের ব্যাংক হিসাবে পরিশোধের ঘটনায় ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং পরামর্শক, প্রিন্টিং ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে ভ্যাট-আয়কর কম কর্তনের ঘটনায় ৪৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড রোড ডিজাইন অনুসরণ না করে সড়ক মেরামত ও নির্মাণে এক কোটি ৯১ লাখ টাকা, সরকারি নকশা অনুসরণ না করে সড়ক নির্মাণে দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং পাঁচটি কালভার্ট নির্মাণ না করেও ব্যয় দেখানোর ঘটনায় ৮২ লাখ ৪১ হাজার টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
ঢাকা জেলা পরিষদের ভবন নির্মাণ ও নিয়োগ: ঢাকা জেলা পরিষদের নির্মাণাধীন আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। পাশাপাশি জেলা পরিষদের নিয়োগ কার্যক্রমে দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিষয়েও অনুসন্ধান করা হয়েছে।
কালের কণ্ঠ
‘প্রত্যাশা ১৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, একসময় মাত্র ০.০১ শতাংশ সুদে জাপানের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেত বাংলাদেশ। ৪০ বছর মেয়াদ, এর মধ্যে ১০ বছর ঋণ পরিশোধে ছাড়—এমন সহজ শর্তের ঋণ দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ, সড়ক, রেল ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে জাপান।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে ঋণের শর্ত। চলতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার সাধারণ নির্দিষ্ট সুদের হার বেড়ে হয়েছে ৩.৫ শতাংশ। ফলে একসময়কার সহজ শর্তের ঋণ এখন বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে তাই অন্যতম অগ্রাধিকার কম সুদের ঋণ সুবিধা ধরে রাখা।
পাশাপাশি অবকাঠামো, জ্বালানি, বন্দর ও যোগাযোগ খাতে নতুন অর্থায়ন এবং বিনিয়োগ চায় বাংলাদেশ। তবে ঋণের বাড়তি সুদের পাশাপাশি বড় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং পরিচালনাগত সমস্যাও জাপানি সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ০.০১ থেকে ৩.৫ শতাংশ সুদ : ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর থেকে বাংলাদেশে জাইকার কার্যক্রম শুরু হয়।
শুরুতে অনুদান, কারিগরি সহযোগিতা ও সহজ শর্তের ঋণ—তিন ধরনের সহায়তাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে বড় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণের গুরুত্ব বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাপানের প্রতিশ্রুত সহায়তার মধ্যে ঋণ ছিল ২৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং অনুদান প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলার।
২০১৫ সালেও জাপানের ঋণের বার্ষিক সুদ ছিল ০.০১ শতাংশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে ছয়টি প্রকল্পে জাপানের এক হাজার ৩৩২ কোটি ৬৫ লাখ ইয়েনের ঋণচুক্তি হয়।
এসব ঋণের সুদ ছিল ০.০১ শতাংশ, পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর। তবে ২০১৫ সালেই বাংলাদেশের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর জাপান ঋণের শর্ত কঠোর করার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সুদ বেড়ে ০.৭ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে তা ১ শতাংশে উন্নীত হয়।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে কিছু ঋণে সুদ ০.৭ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে নতুন ঋণ প্যাকেজে ১ শতাংশ করা হয়। ২০২০ সালেও ঋণের ধরন ও ঋণগ্রহীতার শ্রেণি অনুযায়ী সুদহার ছিল ০.৭ থেকে ১.২ শতাংশ। ২০২২ সালে কিছু ঋণে সুদ ছিল ০.৭ শতাংশ, অন্য প্যাকেজে ১.২ শতাংশ। ২০২৩ সালে কিছু ঋণে তা ১.৬ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৪-২৫ সালে বিভিন্ন প্রকল্পে সুদহার ছিল ১.৩ থেকে ২ শতাংশ। এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সাধারণ স্থির সুদের হার ৩.০৫ শতাংশ এবং ১ অক্টোবর থেকে ৩.৫ শতাংশ হয়। তবে সব ঋণের সুদ এক নয়; ঋণের ধরন, চুক্তির সময় এবং প্রযোজ্য শর্তের ওপর হার নির্ভর করে।
বর্তমান সাধারণ শর্তে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৩০ বছর, যার মধ্যে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড। ঋণের ভাসমান সুদের প্রাথমিক হার তুলনামূলক কম হতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের একটি ঋণের হার প্রায় ১.৮ শতাংশ হলেও বাজারের ভিত্তি হার বাড়লে ভবিষ্যতে সুদও বাড়তে পারে।
সুদ বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ, আন্তর্জাতিক সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি এবং জাপানের নিজস্ব অর্থায়ন ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে। জাইকা সাধারণত ছয় মাস পর পর ঋণের শর্ত পর্যালোচনা করে। তবে নতুন ঋণের সুদ বাড়লেও পুরনো চুক্তির সুদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই হারে বাড়ে না।
অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণেও অর্থায়ন ব্যয়ের পার্থক্য রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহজ শর্তের ঋণে রেয়াতকালে সুদ ১ শতাংশ এবং মূল ঋণ পরিশোধকালে ১.৫ শতাংশ; কিছু অন্য ঋণে হার ২ শতাংশ, আর বাজারভিত্তিক ঋণের সুদ পরিবর্তনশীল। বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রেও আইডিএর সহজ শর্তের ঋণ ও বাজারভিত্তিক আইবিআরডি ঋণের সুদ এক নয়।
জাপানের সহায়তা ৩৪.০৪ বিলিয়ন ডলার: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী জাপান। বাংলাদেশ দূতাবাসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশকে ৩৪.০৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্প সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, পণ্য সহায়তা, কারিগরি সহযোগিতা ও বাজেট সহায়তা রয়েছে। এসব অর্থ ঋণ ও অনুদান—দুই ধরনের সহায়তার মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। এর বিপরীতে ছাড় করা হয়েছে ২৩.৭৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে পুরো প্রতিশ্রুত অর্থকে ঋণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
জাপানের সহায়তায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগ, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তায় (ওডিএ) ৭৩টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে ২৪টি ঋণ সহায়তাপুষ্ট, ৯টি অনুদান সহায়তাপুষ্ট, ৩৭টি কারিগরি সহযোগিতার এবং তিনটি ডিআরজিএ-সিএফ প্রকল্প। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার মেট্রো রেল, মাতারবাড়ী বন্দর, যমুনা রেল সেতু ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘আড়াইশ হোটেল ও রিসোর্ট অগ্নি ছাড়পত্র নেই একটিরও’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত শুরু হচ্ছে আগামী রোববার। পর্যটনের নতুন মৌসুম ঘিরে দ্বীপের ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও পর্যটকের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগ কাটেনি।
দ্বীপে থাকা আড়াইশর বেশি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর একটিরও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনও। অনেক স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পয়োশোধনাগার ও জরুরি নির্গমনপথের মতো মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুপস্থিত। বারবার দাবি সামনে এলেও দ্বীপটিতে গড়ে ওঠেনি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন; নেই অগ্নিনির্বাপণের প্রশিক্ষিত কোনো ইউনিট।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ রিসোর্ট কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। সমুদ্রের প্রবল বাতাসে এসব স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী রোববার থেকে পর্যটক যাতায়াত শুরু হলেও গত বছরের নির্দেশনার সব শর্ত বহাল থাকবে। ফলে নভেম্বরে দ্বীপে রাতযাপন করা যাবে না।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের সুযোগ থাকবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান বলেন, গত বছরের প্রজ্ঞাপনে যেসব নির্দেশনা ছিল, সেটিই অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ এবার সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা বাড়লেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে গত বছরের নিয়মই বহাল থাকছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অগ্নিনিরাপত্তা নেই, ঝুঁকি বাড়ছে
সেন্টমার্টিনের দক্ষিণপাড়া সৈকত সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপের জেটি হয়ে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সৈকতটির পাশে ইট, কাঠ আর বাঁশ দিয়ে নির্মিত হয়েছে কোরাল মুন বিচ রিসোর্ট। এখানে আছে দ্বিতল ছয়টি কটেজ। প্রতিটি কটেজে দুটি করে ১২টি কক্ষ। এর পাশেই বেলা ভিস্তা রিসোর্ট। এটির রয়েছে পাঁচটি কক্ষ।
একইভাবে দক্ষিণপাড়া সৈকতে এল মেরিনা ইকো রিসোর্ট, সিনবাদ এক্সপেরিয়েন রিসোর্ট, স্যান্ড ক্যাসেল রিসোর্ট, এসকেডি আমার বাড়ি রিসোর্ট, ব্লু মেরিন রিসোর্ট-২, সান সেট সেরেন্টি রিসোর্টসহ ২০টির বেশি রিসোর্ট রয়েছে। সবকটিই ইট, কাঠ আর বাঁশের তৈরি।
ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সেন্টমার্টিনে বর্তমানে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা আড়াইশর বেশি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে তৈরি হয়েছে অন্তত ১৫০টি। সবকিছু পরিপাটি থাকলেও কোনো হোটেল-রিসোর্টেরই নেই অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা; নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। পয়োশোধনাগারও নেই। দুর্ঘটনার সময় বের হওয়ার জরুরি পথও অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় দিনের পর দিন এসব প্রতিষ্ঠান এভাবেই চলছে। অনিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন আরও অনেক হোটেলও গড়ে উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বীপের বসতবাড়িতে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম তো নেই, এমনকি দ্বীপের কোনো হোটেল-রিসোর্টে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম নেই। কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার কার্যকর ব্যবস্থাও নেই। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বড় বিপর্যয় হতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, একের পর এক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর স্থানীয় প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি নেই। কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এসব অনিয়ম থেকে সুবিধা নিচ্ছেন।
গত এক বছরে ৩১ হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ ছাড়া দ্বীপে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ১৫টি হোটেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে কোরাল মুন বিচ রিসোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমরান বলেন, আপাতত না থাকলেও ১ নভেম্বর পর প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণের জন্য একটা ব্যবস্থা করা হবে।
টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন সমকালকে বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেলে স্পিডবোট ভাড়া করে টেকনাফ সদর থেকে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে সাগরও উত্তাল হয়ে যায়। তখন যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘সেন্টমার্টিন নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। কারণ, এ দ্বীপের একটি হোটেল-রিসোর্টেরও ফায়ার ছাড়পত্র নেই। এমনকি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও নেই বললেই চলে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল আগামী বৃহস্পতিবার সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিদর্শনে যাবে। এরপর পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠ-বাঁশের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু সেন্টমার্টিনে এগুলোর কিছুই নেই।
ইত্তেফাক
‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: ঘোষণার ১২ দিনেও কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়নি’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১৫ অক্টোবর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার ১২ দিন চলে গেলেও কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। মূলত কর্মী নিয়োগের নিয়ম, অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন ও মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পুরো প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারি পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ঘোষণা এলেও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় কর্মী পাঠানো বিলম্বিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার নতুন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি, ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের অভিযোগ, এজেন্সিগুলো কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পাওয়া দুটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন, তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোথায় হবে, এসব বিষয়ে আমাদের এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। কর্মী নিয়োগের ধাপ, এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব এবং অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট করা
জরুরি। বায়রার সদস্যরা বলেন, আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এবার সেখানে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে আট শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩১২টিকে। এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রসেসিং এজেন্সি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এতে একটি এজেন্সির কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়, সেই অনুযায়ী কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান) বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। এ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এ কারণেই মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করাটা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয় বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাজার খোলার ঘোষণার পাশাপাশি কর্মী পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, তা কার্যকর অভিবাসন কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে আগেই আরো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করার দরকার ছিল।
এ বিষয়ে বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার চালু হওয়ায় আমরা খুশি। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় লোক পাঠানো হবে, কবে থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে, সেসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের এসব বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। ফলে অনেক এজেন্সিই এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে।
এদিকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এখনো মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ২৫টি মেডিক্যাল সেন্টারকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। এই প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। চলতি সপ্তাহ অথবা আগামী সপ্তাহে মেডিক্যাল সেন্টারের অনুমোদন ও মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ঘোষণা আসতে পারে। তবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রত্যেক কর্মীকে কত টাকা ফি দিতে হবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে এখনো কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতা আছে। আশা করি, এসব জটিলতা আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে এবং নভেম্বরের মাঝাামাঝি থেকে কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম সরকার চাইলে ‘ক্রসফায়ারে’ প্রস্তুত পুলিশ!। প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরাধ দমনে সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে- পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বক্তব্য প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। অন্য দিকে পুলিশ সদর দফতর বলেছে, আইজিপি আইন প্রয়োগে কঠোরতা বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন; বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি কথাটি বলেননি।
বিশ্লেষকদের কাছে এ বিতর্কের তাৎপর্য শুধু একটি শব্দের ব্যবহার কিংবা বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং অতীতের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বক্তব্য আইন প্রয়োগের সীমা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
আইজিপির বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
গতকাল সোমবার রাজধানীর চকবাজারের ওয়াটার ওয়ার্করস রোডে শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেটাই করব।’
পুলিশের দায়িত্ব পালন ও বল প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পুলিশ বল প্রয়োগ করলে এক পক্ষ তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যা দেয়, আবার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও ক্ষমতা দেয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, মানুষের সুখে-শান্তিতে বসবাস নিশ্চিত করতে পুলিশের বিকল্প নেই।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কে দেশে আসবেন, কখন আসবেন- তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় নয়। পুলিশের দায়িত্ব হলো আইন ও সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। কেউ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা
বিগত সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন আইজিপি। তার দাবি, তৎকালীন সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন এবং পুলিশের কিছু সদস্যও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
বর্তমানে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলে জানান তিনি। পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কারাগারে পাঠানো, বরখাস্তসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বণিক বার্তা
‘চার শতাধিক সরকারি সেবার কেন্দ্রীয় প্লাটফর্ম মাইগভ ডট বিডি বন্ধ’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সতর্কতা জারির পর গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িকভাবে তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়। একই ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় আরো কয়েকটি ব্যাংকও।
বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পর এবার বন্ধ রাখা হয়েছে সরকারি সেবার কেন্দ্রীয় অনলাইন প্লাটফর্ম মাইগভ ডট বিডি (mygov.bd)। চার শতাধিক সরকারি সেবা এক জায়গা থেকে দেয়ার এ প্লাটফর্ম রোববার দিবাগত রাত থেকে বন্ধ রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, প্রয়োজনীয় প্যাচ হালনাগাদ ও সিস্টেম আপগ্রেডেশন কাজের জন্য ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে এটুআই।
মাইগভ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার নাগরিক সেবা এক প্লাটফর্মে পাওয়ার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে নাগরিকরা বিভিন্ন সরকারি সেবার জন্য অনলাইনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং সেবার অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। গতকাল রাত থেকে একাধিকবার ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। এ সময় সাইটে ‘ওয়েব সার্ভার ইজ ডাউন’ বার্তা দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা আপগ্রেডের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাইটটি বন্ধ থাকবে।
এটুআইয়ের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ন্যাশনাল পোর্টাল) এবং ডিজিটাল প্রডাক্ট ম্যানেজমেন্ট-১-এর ক্লাস্টার হেড ফজলুল জাহিদ পাভেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সিস্টেম আপগ্রেডেশনের কাজের জন্য সরকারি সেবার কেন্দ্রীয় প্লাটফর্ম মাইগভ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। প্লাটফর্মটির নিরাপত্তা স্তর আরো জোরদার করতে এবং প্রয়োজনীয় প্যাচ আপডেট দিতে প্রযুক্তি দল কাজ করছে। ২২ অক্টোবর প্লাটফর্মটির নিরাপত্তা ও আপগ্রেডেশন নিয়ে কাজ শুরু হয়। চূড়ান্ত আপগ্রেডেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে বর্তমানে ওয়েবসাইটটি ডাউন রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা স্তরের প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষ হওয়ার পরই প্লাটফর্মটি পুনরায় চালু করা হবে।’ বিষয়টিকে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত মাইগভ কোনো ধরনের সাইবার হামলার শিকার হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে পিএইচপি-ভিত্তিক ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও অন্যান্য অনলাইন সেবার নিরাপত্তা যাচাই জোরদার করে। বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি যাচাই ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদের জন্য সাময়িকভাবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখে।
পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করায় দেশের সরকারি-বেসরকারি শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন পিএইচপির পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ সংস্করণ ব্যবহারের কারণে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্বলতা শনাক্ত করে সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশ, তথ্য চুরি এবং সেবা অচল করে দেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানায় সরকারের সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট। গত ২২ অক্টোবর সাইবার হামলার সতর্কতা জারির পর গত রোববার আবারো এ-সংক্রান্ত সতর্কবার্তা প্রকাশ করে সার্ট। ‘আনরিজলভড পিএইচপি সিকিউরিটি এক্সপোজারস ইন গভর্নমেন্ট, পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট সেক্টর অর্গানাইজেশনস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সতর্কবার্তায় ঝুঁকিপূর্ণ পিএইচপি সংস্করণ শনাক্ত, নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সংস্করণ হালনাগাদের ওপর গুরুত্ব দেয় সংস্থাটি।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘সারের ডিলারে স্বজন তোষণ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার কৃষকের দোরগোড়ায় ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দিতে নতুন করে ডিলার নিয়োগ দিলেও প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়াও বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত বা সুবিধাপ্রাপ্ত লোকজন, কৃষি কর্মকর্তাদের স্বজনদের হাতে সারের ডিলারশিপ তুলে দেওয়া হয়েছে।
অর্থের বিনিময়ে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদেরও ডিলার করার অভিযোগও রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়মের মাধ্যমে যাঁরা ডিলারশিপ পেয়েছেন, তাঁরা আর্থিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ভবিষ্যতে সার সরবরাহ- ব্যবস্থায় সংকট তৈরি করতে পারেন।
ভুক্তভোগী কৃষকসহ বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের মাধ্যমেই ডিলারশিপের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে কৃষি খাতের কর্তারা বলছেন, শতভাগ নীতিমালার আলোকেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে জেলা-উপজেলা কমিটির বাছাইপ্রক্রিয়াকে। অভিযোগের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলার প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং সার বিতরণ ও মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সারের ডিলার রয়েছেন ৫ হাজার ২০০ জন। আর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সারের ডিলার ৫ হাজার ৬০০ জন। সম্প্রতি সরকার আরও সাড়ে ৪ হাজারের বেশি সারের ডিলার নিয়োগ দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের একটা বড় অংশের অতীতে সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই। নিজের গুদামও নেই। অনিয়মের মাধ্যমে তাঁদের মনোনীত করা হয়েছে।
দেশজুড়ে দলীয় ভিত্তিতে স্বজন তোষণ
যশোরে সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত ৯৮ জনের মধ্যে অন্তত ৬৫ জন বিএনপির নেতা-কর্মী ও তাঁদের নিকট স্বজন বলে জানা গেছে। চৌগাছা উপজেলায় অনুমোদন পাওয়ার এক নম্বর তালিকায় নাম রয়েছে পৌর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা আউলিয়ার ‘মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্স’। দলীয় প্রভাবেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অনেকের অভিযোগ। রেজা আউলিয়া নিজে ডিলারশিপের আবেদন করলেও ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ও সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম। পাতিবিলা ইউনিয়নে আবেদন করেন জহুরুলের স্ত্রী রহিমা আক্তার লিপি। এই ইউনিয়নে সার বিক্রির পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা চারজন আবেদন করলেও দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ রহিমা আক্তারকে।
হাকিমপুর ইউনিয়নে সারের ডিলার পেয়েছে মেসার্স নিশান ট্রেডার্স। এর মালিক উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানের মা ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেগম। অথচ বিএনপি নেতা হাসান কিংবা তাঁর মা কখনোই সারের ব্যবসায় সম্পৃক্ততা ছিলেন না।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের আপন ছোট ভাই মো. মনিরুজ্জামান। তিনি দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান জসিম। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার। অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গুদামের সক্ষমতা যাচাই করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতে নতুন করে ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন ৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে একজন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। বাকিদের বেশির ভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের পদধারী নেতা-কর্মী অথবা তাঁদের পরিবারের সদস্য।
দেশ রূপান্তর
‘বেড়েছে মব সহিংসতা’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাতক্ষীরার দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের (৩৮) বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ১২ অক্টোবর স্থানীয় বাজারে তাকে মারধর করা হয়। পরে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে স্বজনরা তাকে পল্লীচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যান। পরের দিন ফেসবুক লাইভে শামীমের শাস্তি দাবি করে সবাইকে ওই চেম্বারের সামনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান পাশের পারুলিয়া গ্রামের ফজলুল হক আমিনী। একপর্যায়ে কয়েকশ মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করেন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাতে ফজলুল হকের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে আবারও শামীমকে মারধর করা হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। হত্যার পরও ক্ষান্ত হয়নি বিক্ষুব্ধ জনতা; শামীমের বুকের ওপর ওঠে বহু মানুষকে উল্লাস করতে দেখা যায় একটি ভিডিওতে। তার জানাজা ও দাফনেও বাধা দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে দিন কাটছে শামীমের পরিবারের। বাড়িতে থাকতেও ভয় পাচ্ছেন তার স্ত্রী নাজমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। তার আয়ে সংসার চলত। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে চলব; বুঝতে পারছি না। বাড়িতে থাকতেও ভয় লাগে। ও অন্যায় করলে বিচার হতো, কিন্তু এভাবে মেরে ফেলল!’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক মব সহিংসতার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন-তখন মব সহিংসতা হলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর হার কমে এসেছিল। এ ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে গত কয়েক দিনে ফের মব সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত অর্থাৎ ১৫ দিনে মব সহিংসতায় ও গণপিটুনির আটটি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জন নিহতসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন মব সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করছে। অপরাধের বিচার করার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সহিংসতা বা গণপিটুনির ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন সন্দেহভাজন এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার চান্দুটিয়া গ্রামে করিমন চুরির অভিযোগে স্থানীয়দের গণপিটুনিতে মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এই ঘটনায় খালে লাফিয়ে নিখোঁজ হন বিল্লাল হোসেন নামে আরেক জন। ডুবুরি দিয়ে তল্লাশি চালিয়েও খালে তার সন্ধান মিলেনি বলে গতকাল জানিয়েছেন যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ১২ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের হোটেলকর্মী ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) কয়েক দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ তারিখে নোয়াখালীর সোনাপুরে হাসিব ওয়ার্কশপ থেকে ব্যাগ চুরির অভিযোগে প্রতিবন্ধী যুবক কবির হোসেনকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৮ অক্টোবর ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুরে বিএনপি নেতা হোসেন মাঝিকে ছুরিকাঘাতে আহত করার ঘটনায় আসিফ (২৩) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২২ তারিখ রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশু চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মো. আলম শেখকে (৪১)। গত রবিবার রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে এজারুল হক (৪৬) ও সাদিকুল ইসলাম (২৫) নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন রাতে কক্সবাজার উখিয়ার ময়নারঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৮ তে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে আল আমিন (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা নিহত, নারীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। সবশেষ গতকাল সোমবার রংপুর মিঠাপুকুরে চোর সন্দেহে জোড়গাছ দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মো. মাহবুব হোসেনের ছেলে মো. খালিদ হাসানকে (২৫) পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে সকালে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ে রিকশা গ্যারেজে চুরির অভিযোগে মো. হাসান (৩০) নামের আরেক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এরকম মব সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে ধরে মারধর, এমনকি পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হচ্ছে। সেই হামলায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কেউ কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছেন নির্যাতনের দৃশ্য, পরে তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন ফেসবুকে। যেন কাউকে বিনা বিচারে শাস্তি দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের কৃতিত্ব, আর সেই কৃতিত্বের জানান দিতেই এই আয়োজন। অথচ অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অপরাধ নির্ধারণ কিংবা শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা উত্তেজিত জনতার নয়; তা আদালতের। কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা থামছে না। বরং সহিংসতার ঘোষণা, সংঘবদ্ধ হামলা এবং নির্যাতনের ভিডিও প্রচারের মধ্য দিয়ে মব বেড়েই চলেছে।
অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগের তদন্ত ও বিচার আদালতের বিষয়। অপরাধ প্রমাণের আগেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অপরাধের শামিল। বিচারব্যবস্থা ও পুলিশের ওপর আস্থার ঘাটতি থেকে মানুষের মধ্যে এমন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘মাদকের অর্থে হোটেল রিসোর্ট’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের আলোচিত ও আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারি শাহজাহান আনসারী। ইয়াবা কারবার করে কয়েক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে তার। মাদক কারবারের কালোটাকা সাদা করতে নেমেছেন হোটেল ব্যবসায়। কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় নির্মাণ করেন লেগুন বিচ এবং জামান হোটেল নামে দুটি হোটেল। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শাহজাহান আনসারী ও তার স্ত্রী জিগারুননেছা জিনিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
শুধু শাহজাহান আনসারী নন, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ধরে কলাতলী ও ইনানী সৈকতের অসংখ্য বিলাসবহুল হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করেছে মাদক কারবারিরা। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই বিলাসবহুল হোটেল-রিসোর্টগুলোর বড় একটি অংশের নির্মাণ ব্যয় মেটানো হচ্ছে মাদক কারবারের কালোটাকায়। অবৈধ ইয়াবা কারবারের টাকা সাদা করতেই মাদক মাফিয়ারা অভিনব এ কৌশল অবলম্বন করছে।
দীর্ঘদিনের অভিযোগ-মাদক কারবারিরা অবৈধ অর্থ বৈধ করতে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিআইডি এবং দুদকের গোপন নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানেও এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। কক্সবাজারের ৮০ জন মাদক কারবারির অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক। এ বিষয়ে কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মাদক কারবারির অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। আবার কিছু মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে মাদক কারবারিরা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে মাদক থেকে অর্র্জিত কালোটাকা। যার মধ্যে হোটেল-রিসোর্ট খাতও রয়েছে।’ কক্সবাজারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের হওয়া কিছু মামলার তদন্ত এবং কিছু অনুসন্ধান করছে সিআইডি। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে নানান খাতে বিনিয়োগ করেছে কারবারিরা। তদন্তগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকায় জমির দাম ও হোটেলের চাহিদা কয়েক দশক ধরে ঊর্ধ্বমুখী। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ লাভজনক ও নিরাপদ। এ ছাড়া দৃশ্যমান একটি বৈধ ব্যবসা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহ এড়িয়ে চলা সহজ হয়। হোটেলের আড়ালে ইয়াবার বড় চালান লেনদেন ও গোপন বৈঠক করাও কারবারিদের জন্য সুবিধাজনক। মাদকের কালোটাকা সাদা বা বৈধ করার জন্য হোটেল ব্যবসাকে একটি নিখুঁত ‘লন্ড্রোম্যাট’ হিসেবে ব্যবহার করছে কারবারিরা। হোটেল, রিসোর্ট, কটেজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মাদক কারবারিরা কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করে। প্রথমে নিজেদের নামে জমি না কিনে স্ত্রী, শ্যালক, ভাই বা দূরের কোনো আত্মীয়ের নামে জমি কেনে। পরে ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে বস্তা ভর্তি নগদ টাকায় রড, সিমেন্ট ও নির্মাণসামগ্রী কেনা হয়। ফলে এই টাকার কোনো বৈধ উৎস দেখাতে হয় না। হোটেল বা কটেজ নির্মাণের পর তারা কাগজপত্রে দেখায় যে সারা বছর তাদের হোটেল পর্যটকে ভরপুর থাকে। খাতায় ভুয়া অতিথিদের নাম লিখে বুকিংয়ের টাকা হিসেবে মাদকের টাকা ব্যাংকে জমা করা হয়। এভাবেই ইয়াবা বিক্রির কালোটাকা হোটেলের ‘বৈধ আয়’ হিসেবে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করে এবং পুরোপুরি সাদা হয়ে যায়। সিআইডি (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট অনুসন্ধানকারী বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, কক্সবাজার ও টেকনাফকেন্দ্রিক অন্তত তিন শতাধিক ইয়াবা গডফাদার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। কলাতলী কটেজ জোন এবং মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এদের অন্তত ১৫০টি বেনামি কটেজ ও রিসোর্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। জানা যায়, ২০০০ সালে কক্সবাজারে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজ ছিল দুই শতাধিক। ২০১০ সালে সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৫০০। ২০২০ সালে তা বেড়ে হয় ১ হাজার। বর্তমানে কক্সবাজারে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় নতুন করে গড়ে উঠেছে শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মাদক কারবারের অবৈধ টাকা বৈধ করতেই হোটেল এবং রিসোর্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে কারবারিরা। অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের এ কৌশলকে বলা হয় রেশনাল চয়েজ।’
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধান এবং দায়েরকৃত মামলার তদন্ত করছে। অনুসন্ধানে কক্সবাজার অঞ্চলের মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ এবং বিনিয়োগ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে মাদক কারবারিরা হোটেল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ।’ এ বিষয়ে কথা হয় মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান করছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক কারবারি হিসেবে সমাজে যে নেতিবাচক পরিচিতি থাকে, একজন হোটেল মালিক হিসেবে তা সহজেই ঢাকা পড়ে।
