সাম্প্রতিক সময়ে মাঠ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার আচরণ, বিতর্কিত বক্তব্য ও অরাজনৈতিক কার্যকলাপ সমগ্র সিভিল সার্ভিসের পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল লঙ্ঘন, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান প্রকাশ কিংবা সহকর্মীদের মধ্যকার অনভিপ্রেত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরে একজন বিভাগীয় কমিশনারের শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে একজন ইউএনও’র অরাজনৈতিক বক্তব্যের সময় তালি দেওয়া ও নিজেকে ‘বিএনপির নেতা’ দাবি করা এবং সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ইউএনও ও এসি ল্যান্ডের মধ্যকার দ্বন্দ্বের অপ্রীতিকর আত্মপ্রকাশ- প্রতিটি ঘটনাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আচরণবিধির চরম পরিপন্থী। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক; কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির অনুসারী নন। সংবিধান ও সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা বাধ্যতামূলক। যখন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দেন, তখন পুরো প্রশাসনিকব্যবস্থার ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যায়।
প্রশাসনের এ জাতীয় নৈতিক স্খলন ও পেশাদারত্বের অভাব আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, যোগ্যতাভিত্তিক পদায়নের অভাব এবং কার্যকর জবাবদিহি নস্যাৎ করার দরুন আমলাতন্ত্রে এ জাতীয় সংস্কৃতি শিকড় গেড়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তুষ্টিসাধন করে সুবিধাজনক পদায়ন পাওয়ার মানসিকতা মাঠ প্রশাসনকে ক্রমেই অকার্যকর ও বিতর্কিত করে তুলছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও যখন ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও পুরনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়- তখন এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
তবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে সমগ্র প্রশাসনব্যবস্থা বা নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা ও সততাকে ঢালাওভাবে বিচার করা সমীচীন নয়। বরং এ ধরনের অঘটনকে একটি সতর্কসংকেত হিসেবে দেখে কার্যকর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রথমত, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক। কেবল স্ট্যান্ড রিলিজ বা সাময়িক সংযুক্তিই যথেষ্ট নয়; আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুত্ব বিচারে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাদের পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। মেধা, সততা, দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতাকে পদায়নের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তৃতীয়ত, সিভিল সার্ভিসে যোগদানের পর রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার, প্রটোকল, পেশাগত নীতিশাস্ত্র এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়ে নিবিড় ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যকার সম্পর্ক এবং সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক পেশাগত আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্পষ্ট ও কঠোর দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
একটি গণতান্ত্রিক ও সুশাসিত রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্র। সাময়িক কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে আড়াল না করে কিংবা ঢালাওভাবে পুরো প্রশাসনকে দোষারোপ না করে, নিরপেক্ষ তদন্ত, কঠোর অনুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কারের পথ অনুসন্ধান করাই এখন প্রধান কর্তব্য। মাঠ প্রশাসন যেন কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের মঞ্চ না হয়ে কেবল জনসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়- সরকারকে তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
