Published on
:
3 min read
এই সময়: গত কয়েক বছরে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার ও আদানি গোষ্ঠীর মধ্যে আঁতাঁতের অভিযোগ তুলে বহুবার সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলি। এ নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর এখনও অব্যাহত। এই আবহে গত ৯ অক্টোবর ‘হাউ মোদী অ্যান্ড আদানি স্টোল ইন্ডিয়া: দ্য ফ্রেন্ডশিপ ফাইলস’ নামে প্রায় ৩৬ মিনিট ৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা হয়। এই ভিডিয়োয় অসত্য তথ্য তুলে ধরে ইচ্ছাকৃত ভাবে আদানি গোষ্ঠীর সম্মান ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে— অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল।
সেই মামলায় সোমবার বিচারপতি আর্যক দত্ত আপাতত এই সব ভিডিয়োর সব রকম প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ— সংশ্লিষ্ট ভিডিয়ো, তার ক্লিপ বা একই ধরনের অন্য ভিডিয়ো তৈরি বা প্রকাশ, আপলোড, শেয়ার সবকিছুই আপাতত বন্ধ থাকবে। আগামী বছর ৩১ জানুয়ারি অথবা পরবর্তী নির্দেশ না–হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ দিন সকালেই বিচারপতি দত্তের এজলাসে ‘আদানি এন্টারপ্রাইজ়েস লিমিটেডে’র তরফে এই মামলার জরুরি শুনানি চেয়ে আবেদন করা হয়। আদালত অনুমতি দিলে বেলা দুটোয় শুনানি শুরু হয়। আদানিদের তরফে আইনজীবী অনির্বাণ রায় ও সঞ্জয় বসু তাঁদের সওয়ালে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে গৌতম আদানির সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এই ভিডিয়োটিতে বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগকে এমন ভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে দর্শকের মনে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়।’ গুজরাটে জমি বরাদ্দ, এক টাকায় জমি পাওয়া, কয়লা খনি নিলামে পাওয়া এবং মুম্বই বিমানবন্দরের বরাত পাওয়ার মতো বিষয় তুলে ধরে আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলেও আদালতে অভিযোগ জানানো হয়। বিচারপতি দত্তের বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট সবক’টি সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিয়োটি সরানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট ইউআরএলের মাধ্যমে তার প্রচার বন্ধেরও নির্দেশ দিয়েছে।
আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ— সংশ্লিষ্ট ভিডিয়োটি কোনও সংবাদ প্রতিবেদন বা বিচারাধীন মামলার বিবরণ নয়। বরং এটি নাট্যরূপ হিসেবে তৈরি হয়েছে, যার শিরোনামেই চুরির অভিযোগের ইঙ্গিত রয়েছে। ভিডিয়োর বর্ণনা ও দৃশ্যগুলিকে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে সেগুলি বাস্তব ঘটনা বলে মনে হতে পারে। আদালতের আরও বক্তব্য, ভিডিয়োতে আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থ জোগানো, কৃষকদের মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো এবং পুলিশি নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলি নিছক মতামত বা রাজনৈতিক সমালোচনার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট দাবি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অথচ ওই অভিযোগগুলির সমর্থনে কোনও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের উল্লেখ নেই। আদানি গোষ্ঠী এবং তাদের ব্যবসার নাম ওই ভিডিয়োতে এমন ভাবে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফলে নাট্যরূপান্তরে দেখানো যাবতীয় তথ্য তাদের সঙ্গেই সম্পর্কিত বলে মনে করেছে আদালত। সরকারের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানানোর পরে মূল ভিডিয়োটি ভারতে নিষ্ক্রিয় করা হলেও, পরে তার পুনঃপ্রকাশের ঘটনাও আদালতের বিবেচনায় এসেছে। তবে আদালত এটাও জানিয়ে দিয়েছে, এই পর্যবেক্ষণ মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। মানহানির অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পরে।
আদালত জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষ, তাদের সহযোগী এবং তাদের নির্দেশে কাজ করা ব্যক্তিরা ভিডিয়োটি বা তার ক্লিপ, সংক্ষিপ্ত সংস্করণ কিংবা মূল ভিডিয়োর সঙ্গে বস্তুগত ভাবে অভিন্ন কোনও সংস্করণ প্রকাশ বা প্রচার করতে পারবেন না। এই ভিডিয়োয় থাকা মানহানিকর বক্তব্য এবং তার অনুরূপ বক্তব্য প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ইউটিউব, এক্স, ইনস্টাগ্রাম–সহ সংশ্লিষ্ট সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, চ্যানেল ও পেজ থেকে অবিলম্বে ভিডিয়োটি সরাতে বলেছে আদালত। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলির গ্রাহক-পরিচয়, নিবন্ধনের তথ্য, আপলোডের সময়কার আইপি লগ এবং অ্যাক্সেস লগ সংরক্ষণ করারও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। যে সব অ্যাকাউন্টের ব্যবহারকারীর পরিচয় স্পষ্ট নয়, তাদের প্রাথমিক তথ্য দু’সপ্তাহের মধ্যে সিল করা খামে হলফনামা দিয়ে জমা দিতে হবে। আদানি গোষ্ঠীর তরফে আইনজীবীদের সওয়াল, ২০০০ সালে আদানিদের মুম্বই বিমানবন্দরের বরাত পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও ২০২৬–এ তৈরি এই ভিডিয়োতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ‘আইন অর্থের কাছে মাথা নত করে— এমন বক্তব্যের মাধ্যমেও আমাদের মক্কেলকে অসম্মান করা হয়েছে।’ শুধু ব্যবসায়িক বরাত বা সম্পত্তি বৃদ্ধির অভিযোগ নয়, মুন্দ্রা বন্দরে মাদক উদ্ধারের ঘটনাকেও ভিডিয়োতে যে ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়েও আপত্তি জানায় আদানি গোষ্ঠী। আইনজীবীদের অভিযোগ, ভিডিয়োটি ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি প্ল্যাটফর্মেই ভিডিয়োটির দর্শকসংখ্যা ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে আদালতে জানান আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি, আদালতে মামলা চললেও ভিডিয়োটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা নিজেদের মতামত দিচ্ছেন।
শুনানির সময়ে বিচারপতি জানতে চান, ভিডিয়োটি কি এআই নির্মিত? উত্তরে আদানি গোষ্ঠীর আইনজীবীরা জানান, এটি এআই দিয়ে তৈরি নয়। ভিডিয়োটির নির্মাতা নিজেই তা তৈরির দায় স্বীকার করেছেন। মামলার একটি পক্ষ গুগলের তরফে আইনজীবী প্রজ্ঞা জৈন মামলার গ্রহণযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যদিও তিনি জানান, আদালত যদি ভিডিয়োটি সরানোর নির্দেশ দেয়, তা হলে তাঁদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সেটি সরিয়ে দেওয়া হবে।
