সাজেক সংকট প্রত্যাহারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শেষে সাজেক গণঅধিকার আন্দোলন ও সাজেক কার্বারি অসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন সাজেক গণঅধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৮টায় সাজেক গণঅধিকার আন্দোলনের ফেসবুক পেজে এক লাইভে তিনি এই ঘোষণা দেন। সরকার থেকে তাদের পাঁচ দফা দাবি মেনে না নেওয়ায় এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ সময় তিনি বলেন, ‘‘আমাদের পাঁচ দাবির মধ্যে চারটি দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানায় সরকার। আমাদের যে মূল দাবি সন্তু লারমার সশস্ত্র গ্রুপকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সেটার জন্য তারা প্রথমে এক মাস সময় চেয়েছে, আমরা তিনদিন সময় দিতে রাজি হয়েছি। শেষ পর্যন্ত তারা ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে, আমরা আগামী ৫ দিন সময় দিতে রাজি হয়েছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে পুরোপুরি আশ্বাস না দেওয়ায় আমরা শেষ পর্যন্ত সড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিচ্ছি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকার চাইলে একদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধান করতে পারে, কিন্তু তাদের ইতিবাচক মনোভাবের অভাবে তারা তালবাহানা করছে বলে আমাদের মনে হয়েছে। তাই চলমান আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিচ্ছি। সরকার যদি আবারও আলোচনার টেবিলে বসতে চায়, আমরা বসতে রাজি আছি।’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘অতীতে সরকার একদিনের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা সমাধান করেছে কিন্তু এবার আমাদের তরফ থেকে একাধিকবার সময় দেওয়ার পরও তারা দাবি মেনে নিতে তালবাহানা করছে।’’ তিনি এ সময় দ্রুত সময়ের মধ্যে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে সোমবার দুপুর ৩টায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সাজেকের উজোবাজারে যান। এসময় তারা ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাট পরিদর্শন করেন। পরে বাজারে কেয়ার পয়েন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে আলোচনা সভায় মিলিত হন।
এসময় বৈঠকে অংশ নেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি খাগড়াছড়ির সাংসদ ওয়াদুদ ভূইয়া এমপি, রাঙামাটি সাংসদ দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান, রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিবসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সাজেক গণঅধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা নেতৃত্বে এসময় একদল আন্দোলনকারী বৈঠকে অংশ নেন।
পাঁচ দফা দাবিগুলো হচ্ছে- অবরোধকারীদের ওপর হামলার সাথে জড়িতদের শাস্তি এবং দায়ের করা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। উজো বাজারের স্থানীয় দোকান ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। উজোবাজার থেকে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরকে সরিয়ে নিতে হবে। আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসাভার গ্রহণ করতে হবে। জেএসএসের সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে অতি দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে হবে। আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের কাউকে সন্ত্রাসী তকমা লাগিয়ে গ্রেফতার, হয়রানি ও তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি করা যাবে না।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে স্থানীয় দুটি সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অবরোধকারী এবং একটি পাহাড়ি সংগঠনের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে প্রত্যাহার, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের দেওয়া পূর্বের আশ্বাস বাস্তবায়নের দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখার পর দাবি আদায় না হওয়ায় সংগঠন দুটি ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। সেই অবরোধ তৃতীয় দিনের মতো শনিবার (২৪ অক্টোবর) অব্যাহত রয়েছে। এতে পর্যটকরা সাজেকে যেতে পারছেন না।
অবরোধের প্রথম দিনে সাজেক ভ্যালিতে প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়েন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়ি বহরকে নিরাপত্তা দিয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে রওনা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয়টি সাজেকের উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারী ও পিকেটাররা সড়কে ব্যারিকেড ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে তাদের পথরোধ করে। দীর্ঘ সময় আলোচনার পরও অবরোধকারীরা পথ ছাড়তে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
