পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে দ্রুত বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন। বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের উৎস হিসেবে সৌরশক্তি এখন পারমাণবিক শক্তিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক দশক আগেও বিশ্বের মোট বিদ্যুতের মাত্র ১ শতাংশ আসত সৌরশক্তি থেকে। ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পারমাণবিক শক্তিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে সৌরবিদ্যুৎ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমবারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন পারমাণবিক বিদ্যুৎকে সামান্য ছাড়িয়ে যায়। বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পারমাণবিক বিদ্যুতের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি হয়েছে।
এমবারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেভ জোনস বলেন, বিশ্বের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বেশি হওয়া সত্যিই অবিশ্বাস্য।
চীনের বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে শুরু করে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি—বিভিন্ন কারণে এই খাতের অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটেছে। সৌরবিদ্যুতের এই সাফল্যের পেছনে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
১. প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে সৌরবিদ্যুৎ
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ও জলবায়ুনীতিবিষয়ক অধ্যাপক ইয়ান রোজেনো বলেন, বিদ্যুৎ খাতের রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে সৌরশক্তি।
ইতিহাসে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উৎস এখন সৌরবিদ্যুৎ। বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এর অবদান সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা যতটা বেড়েছে, তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করেছে সৌরবিদ্যুৎ। এ ক্ষেত্রে বায়ুবিদ্যুৎকেও ছাড়িয়ে গেছে সৌরশক্তি। যদিও বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদনও বাড়ছে, তবে তুলনামূলক ধীরগতিতে।
রোজেনোর মতে, সৌরবিদ্যুতের এই প্রবৃদ্ধি অনেকের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাসহ (আইইএ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে সৌরবিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি বারবার কম করে অনুমান করা হয়েছে। কারণ, এসব পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি সরলরৈখিক হবে এবং ব্যয় ধীরে ধীরে কমবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বাস্তবে দুটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তন ঘটেছে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত।
২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন মোটামুটি একই পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ গুণ।
২. অবিশ্বাস্যভাবে কমেছে সৌরবিদ্যুতের খরচ
প্রায় ১৫ বছর ধরে পরিণত প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত সৌরবিদ্যুৎ ২০২০ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের উৎস হয়ে ওঠে। এরপর উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে, সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা উন্নত হয়েছে এবং প্যানেল তৈরিতে ব্যবহৃত সিলিকন ও রুপার পরিমাণ কমেছে। ফলে উৎপাদন খরচও আরও কমেছে।
অধ্যাপক রোজেনো বলেন, চীনের বিপুল উৎপাদনক্ষমতা এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে সৌর প্যানেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে নেমে এসেছে।
ডেভ জোনসের ভাষায়, সৌর প্যানেলের দাম এখন এতটাই কম যে তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। একটি প্যানেলের দাম ১০০ ডলারেরও কম হতে পারে। অথচ কোনো অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়াই সেটি ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে।
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ই আনছে না; জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সুফল বয়ে আনছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতে ২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের সুবিধা পাওয়া গেছে।
৩. বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সৌরশক্তির ব্যবহার
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে চীন এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ। তবে এ খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে আরও অনেক দেশ।
সৌরবিদ্যুৎ আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের শুল্ক আরোপ করলেও দেশটি এখনো সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। সেখানে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন—এমন অঙ্গরাজ্যগুলোতেও সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ ঘটছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে দেশটির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রূপান্তরবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যালিসিয়া ঝাও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবৃদ্ধি সীমিত করে এমন শুল্ক ও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে ব্যয় বাড়তে পারে এবং সম্প্রসারণের গতি কমতে পারে। তবে অর্থনৈতিক সুবিধার কারণেই সৌরবিদ্যুতের প্রসার দ্রুত হচ্ছে। খরচ কিছুটা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম সস্তা উৎস সৌরশক্তি। রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, এর সম্প্রসারণ থেমে নেই।
ভারতও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে দ্রুত এগোচ্ছে। গত দুই বছরে দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদা যতটা বেড়েছে, তার ৬০ শতাংশ পূরণ করেছে নতুন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন।
অস্ট্রেলিয়ায় এখন ৪০ লাখেরও বেশি বাড়িতে ছাদে সৌর প্যানেল রয়েছে, যা দেশটির মোট পরিবারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
৪. অনির্ভরযোগ্য জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প সৌরশক্তি
পাকিস্তান ও লেবাননের মতো দেশেও দ্রুত সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ সৌর প্যানেল স্থাপন করা হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে ডিজেলের দাম বেড়েছে। এতে অনেক দেশে সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা অনির্ভরযোগ্য হওয়ায় বাড়িতে ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। এখন চীন থেকে আমদানি করা সৌর প্যানেল এসব জেনারেটরের বিকল্প হয়ে উঠছে।
ডেভ জোনস জানান, তেলের ওপর নির্ভরতা ও দূষণ কমাতে ইথিওপিয়া পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ করেছে।
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎব্যবস্থা যখন চাহিদা মেটাতে পারছে না, তখনো সৌরবিদ্যুৎ নতুন সরবরাহের সুযোগ তৈরি করছে। পাকিস্তান এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১৯ সালে দেশটির মোট বিদ্যুতের ২ শতাংশেরও কম আসত সৌরশক্তি থেকে। বর্তমানে তা বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, অনির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং চীন থেকে সস্তায় সৌর প্যানেল আমদানির কারণে এই পরিবর্তন ঘটেছে।
জোনস বলেন, পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এর বেশির ভাগ ব্যয় বহন করেছেন সাধারণ মানুষ নিজেরাই। ঋণ না নিয়েও অনেকেই সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারছেন।
লেবানন থেকে নাইজেরিয়াসহ সূর্যালোকপ্রবণ অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অধ্যাপক রোজেনোর মতে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবারগুলো সরকার বা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই নিজেদের বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারছে। অনিশ্চিত সময়ে এই স্বাধীনতা ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. ব্যাটারির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় দিনের বেলায়, যখন সূর্যের আলো থাকে। কিন্তু দিন-রাতের যেকোনো সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হলে এর সঙ্গে ব্যাটারি সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি ব্যাটারির দামও দ্রুত কমেছে। এতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো সহজ হয়েছে। অধ্যাপক রোজেনো বলেন, সূর্যালোকপ্রবণ অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির সমন্বিত ব্যবস্থা এখন নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। দিনের মাঝামাঝি সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সন্ধ্যায় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণেও ব্যাটারি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদার গড়ে এক-চতুর্থাংশের বেশি পূরণ করেছে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির সমন্বিত ব্যবস্থা। ভারমন্টের মতো অঙ্গরাজ্যেও সৌর প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত বাড়ির ব্যাটারি বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে দীর্ঘ সময়, ঋতুভেদে কিংবা মেঘলা ও বর্ষাকালে ব্যবহারের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সামগ্রিক বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে সৌরশক্তির কার্যকর সমন্বয় জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
৬. সব খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা
যেসব ক্ষেত্রে আগে বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত ছিল, সেখানেও বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তি বাড়ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তুরস্কে এ বছরের জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনেও বিদ্যুতায়নকে প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হিসেবে রাখা হয়েছে।
ডেভ জোনসের মতে, সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস নয়, ভবিষ্যতে সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থারও অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিকল্পনা জরুরি বলে সতর্ক করেছেন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংরক্ষণবিষয়ক পরিষদের প্রধান নির্বাহী জুলিয়া সাউডার। তার মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া বিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো এবং বিদ্যুৎব্যবস্থায় বিপুল নতুন চাহিদা যুক্ত করা ঝুঁকিপূর্ণ। এতে পুরো ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। শুধু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
অধ্যাপক রোজেনো বলেন, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে এখন প্রধান বাধা প্যানেল বা উৎপাদন খরচ নয়; বরং বিদ্যুৎ গ্রিড, শক্তি সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং বিদ্যুতের চাহিদা কত দ্রুত বাড়ছে, তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা। এখন প্রশ্ন সৌরবিদ্যুৎ বাড়বে কি না, তা নয়; বরং বিদ্যুৎব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে কি না।
অ্যালিসিয়া ঝাও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশক পর আবার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ তথ্যকেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও বিদ্যুতায়ন। দেশটিতে জ্বালানি নিরাপত্তাও এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৯০ শতাংশেরও বেশি ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসছে। দ্রুত স্থাপনযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের চাহিদা ভবিষ্যতে এ খাতের আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
৭. নতুন প্রযুক্তিতে বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার
গত কয়েক বছরে জার্মানিতে প্লাগ-ইন সৌর প্যানেল বা ‘বারান্দার সৌরবিদ্যুৎ’ দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। ছাদের সৌর প্যানেলের তুলনায় এগুলো কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে সাধারণ বৈদ্যুতিক সকেটের মাধ্যমে সরাসরি বাড়ির বিদ্যুৎব্যবস্থায় সংযুক্ত করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ ও অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের প্রযুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষিকাজের সঙ্গে সৌর প্যানেল স্থাপনের সমন্বিত পদ্ধতি ‘অ্যাগ্রিভোল্টাইকস’ নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। কোনো কোনো এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই জমিতে কৃষি উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, আয়না ব্যবহার করে সৌরশক্তি কেন্দ্রীভূত করার প্রযুক্তি, পেরোভস্কাইট সৌর প্যানেল এবং সৌরশক্তি উৎপাদনে সক্ষম জানালার মতো প্রযুক্তিও আগামী বছরগুলোতে সম্প্রসারিত হতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে সৌরবিদ্যুতের জন্য?
ডেভ জোনসের মতে, ২০২৬ সালেও বিশ্বে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়বে। তবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এর সম্প্রসারণের গতি কিছুটা কমে আসতে পারে।
এর একটি কারণ চীন। গত গ্রীষ্মে দেশটি নতুন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা পরিচালনা ও সহায়তার নীতিতে পরিবর্তন আনে। এর ফলে পুরোনো মূল্যব্যবস্থার সুবিধা নিতে ২০২৫ সালে বিপুলসংখ্যক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছিল। তবে চীনের বাইরে পরিস্থিতি ভিন্ন। জোনসের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনকে হিসাবের বাইরে রাখলে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর আরও বেশি সৌর প্যানেল স্থাপন করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। তখন জলবিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হয়ে উঠতে পারে সৌরশক্তি।
অধ্যাপক রোজেনো বলেন, যেসব এলাকায় বিদ্যুতের দাম বেশি এবং সরবরাহ অনির্ভরযোগ্য, সেখানে সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা মানুষকে এর দিকে আকৃষ্ট করছে। তবে চীনা সৌর প্যানেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়লে এই সম্প্রসারণের গতি কমতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা উদ্বেগজনক খবর এসেছে। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য অতিক্রম করার আশঙ্কা এখন অত্যন্ত বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে এবং চলতি শতাব্দীতে পৃথিবী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত সীমা অতিক্রমের ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের সাফল্য দেখাচ্ছে, এমন কিছু ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হচ্ছে, যা এক দশক আগেও অনেকের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। ডেভ জোনসের মতে, তখন খুব কম মানুষই সৌরবিদ্যুতের এমন প্রবৃদ্ধির কথা ভাবতে পেরেছিলেন। পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনও কমেছে।
বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের এই দ্রুত উত্থান তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিত্রই বদলাচ্ছে না, বরং জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সূত্র: বিবিসি
