ময়নাকাটা নদীর উৎপত্তি আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে। শিবচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে পাঁচ্চর ও মাদবরেরচর হয়ে নদীটি পদ্মার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে আড়িয়াল খাঁ ও পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থলের একাধিক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশেও সংকুচিত হয়েছে নদীর প্রবাহ। ওই অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থলের কিছু জায়গায় মাটি ফেলে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
পাঁচ্চর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, একসময় বর্ষা মৌসুমে পদ্মা থেকে প্রচুর পানি ময়নাকাটা নদীতে প্রবেশ করত। নদীপথে সহজেই পণ্য পরিবহন করা যেত। সময়ের সঙ্গে পদ্মার সংযোগস্থল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ কমে গেছে। পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও বসতবাড়ি। কোথাও কোথাও নদী এতটাই সরু হয়ে পড়েছে যে এর স্বাভাবিক পরিচয় বোঝাও কঠিন।
মাদবরেরচর এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ‘ময়নাকাটা নদীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো পদ্মার সঙ্গে সংযোগস্থল। ওই সংযোগ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে মাটি ভরাট করে বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ফলে পদ্মা থেকে ময়নাকাটা নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এখন আর নেই।’
চর টেকেরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. খালেক বলেন, ‘আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ময়নাকাটা নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। এখন সংযোগস্থল বালু জমে পুরোপুরি ভরাট হয়ে আছে। আট-দশ বছর আগে খনন শুরু হয়েছিল। কিছুদিন কাজ চলার পর আর দেখা যায়নি। খননের কাজও পুরোপুরি হয়নি। দিন দিন নদীটি আরও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।’
নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের ৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান শিবচর উপজেলার চর টেকেরহাট থেকে শিবচর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার নৌপথের খননকাজ উদ্বোধন করেন। ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির আওতায় আট লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করে নৌপথটি সচল করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে প্রকল্পের আওতায় শেষ পর্যন্ত কতটুকু খনন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কিছুদিন কাজ চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে খননকাজ শুরুর স্থানগুলোর কয়েকটি অংশও পুনরায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল কতটা পাওয়া গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একসময় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম ভরসা ময়নাকাটা নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী। তাদের মতে, নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে আশপাশের কৃষিজমি ও জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব কমতে পারে।
নদী রক্ষায় সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধ, প্রয়োজনীয় খনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নদীটির অবশিষ্ট অংশও একসময় হারিয়ে যাবে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, বিআরএস নকশা ও পর্চা অনুযায়ী নদীটির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার প্রতিটি নদী ও খালের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণের প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের পর এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির বলেন, শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী ময়নাকাটা নদীর অনেক স্থানেই দখল ও নাব্যতা সংকটের কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পথে। তবে বর্তমানে ময়নাকাটা নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যক্রম তাদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নদীটি উদ্ধার ও খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
স্থানীয়দের কাছে ময়নাকাটা নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি অতীতের নৌযোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। দখল ও ভরাটের কারণে নদীটির অস্তিত্ব সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি কমছে স্থানীয় নৌযোগাযোগের সম্ভাবনাও। তাই নদীর সীমানা চিহ্নিত করে অবৈধ দখলমুক্ত করা, পরিকল্পিত খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী এই নদীটি মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
The post দখল-দূষণ ও ভরাটে সংকুচিত ময়নাকাটা নদী, হারাচ্ছে নৌপথের অস্তিত্ব appeared first on ভোরের চেতনা.
