পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বেছে নিতে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোটের লাইনে দাঁড়াবে ইজ়রায়েল। ইহুদি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রধানের কুর্সি পাবেন কে? নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পরাজিত হলে কি পশ্চিম এশিয়ায় বন্ধ হবে যুদ্ধ?
০১ / ১৬
যুদ্ধের মধ্যেই ইজ়রায়েলে নির্বাচন। ২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার, পশ্চিম এশিয়ার এই ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রে রয়েছে ভোটগ্রহণ। এ বারের ভোটে কি কুর্সি হারাবেন ‘বিবি’? নতুন কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে কি ইরান, হামাস বা হিজ়বুল্লার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করবে তেল আভিভ? কোন খাতে বইবে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক? এই সমস্ত প্রশ্নেরই জবাব খুঁজছে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞ মহল।
০২ / ১৬
ইজ়রায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থার নির্বাচন পদ্ধতি ভারতের মতো নয়। ইহুদি রাষ্ট্রটিতে রয়েছে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’। আর তাই প্রার্থী নন, পছন্দমাফিক দলকে ভোট দিয়ে থাকে সেখানকার আমজনতা। তেল আভিভের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর মোট আসন সংখ্যা ১২০। যার জেরে ৬১ হল সরকার গঠনের ‘জাদু-সংখ্যা’। জনমত সমীক্ষায় সেই অঙ্ক থেকে পিছিয়ে আছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বে়ঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওরফে ‘বিবি’।
ইজ়রায়েলি নিউজ় চ্যানেলগুলির দাবি, এ বারের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না কোনও দল। ৪৮ থেকে ৫০টি আসন পেতে পারে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জোট। অন্য দিকে, ‘পরিবর্তন জোট’-এর ৫২ থেকে ৫৬টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এর নেতৃত্বে রয়েছে নতুন মধ্যপন্থী দল ‘ইয়াশার’-এর গাদি আইজ়েনকোট। এ ছাড়া, আরব জোটের ১৪ জন ‘নেসেট’-এ আসন পেতে পারেন বলেও মনে করা হচ্ছে।
০৪ / ১৬
তবে, এ বারের নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে আইজ়েনকোটের ‘ইয়াশার’। জনমত সমীক্ষা মিলে গেলে ২১-২৩টি আসন পাবে তারা। সে ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সাংসদ সংখ্যা কমে দাঁড়াতে পারে ১৯-২০টির মধ্যে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফের ‘বিবি’কে চাইছেন ৪১ শতাংশ ইহুদি। অন্য দিকে, ৪৯ শতাংশ ঝুঁকে আছেন আজ়েনকোটের দিকে, জানিয়েছে ‘মারিভ’ পত্রিকা।
০৫ / ১৬
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এ বারের ভোটে ইজ়রায়েলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস হামলা। ওই দিন প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকা থেকে ইহুদি ভূমিতে ঢুকে গণহত্যা চালায় ইরানের মদতপুষ্ট সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী। এতে প্রাণ হারান অন্তত ১,২০০ জন। ঘটনা ঘটার পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন ‘বিবি’। সেই সংঘাতে যোগ দিতে দেরি করেনি লেবাননের হিজ়বুল্লা ও তেহরান।
০৬ / ১৬
হামাস, হিজ়বুল্লা ও ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইতে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে প্রত্যাঘাত শাণায় ইজ়রায়েলি ফৌজ। শুধু তা-ই নয়, শত্রুদের কোমর ভাঙতে প্যালেস্টাইনের গাজ়া ও লেবাননে লাগাতার বোমাবর্ষণ চালাতে থাকে ইহুদি বিমানবাহিনী। ফলে, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে দেখা দিয়েছে মানবিক সঙ্কট। এতে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে তেল আভিভ। নানাবিধ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের।
০৭ / ১৬
উদাহরণ হিসেবে গত বছরের (পড়ুন, ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরের কথা বলা যেতে পারে। ওই সময় রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার বৈঠক চলাকালীন প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়ে বসে ফ্রান্স ও ব্রিটেন-সহ একগুচ্ছ ইউরোপীয় দেশ। পাশাপাশি, ইজ়রায়েলকে হাতিয়ার সরবরাহেও রাশ টানে তারা। গত কয়েক দশক ধরে যাদের সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্রটির ‘গলায়-গলায়’ বন্ধুত্ব রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ফলে, প্রশ্নের মুখে পড়ে ‘বিবি’-র বিদেশনীতি।
০৮ / ১৬
উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধ-মন্ত্রিসভায় (ওয়ার ক্যাবিনেট) যোগ দেন আইজ়েনকোট। কিন্তু, কিছু দিনের মধ্যেই নানা ইস্যুতে মতপার্থক্য তৈরি হয় তাঁর। ফলে, ২০২৪ সালের জুনে ইস্তফা দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। যুদ্ধ-মন্ত্রিসভা ত্যাগের পর ‘বিবি’-র অধিকাংশ সামরিক সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এই ঘটনাকে দুই নেতার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খার লড়াই বলে উল্লেখ করেছে পর্যবেক্ষক মহল।
০৯ / ১৬
নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, ২০১৫-১৯ সাল পর্যন্ত ইহুদি রাষ্ট্রটির স্থলবাহিনী ‘ইজ়রায়েল ডিফেন্স ফোর্স’ বা আইডিএফ-এর প্রধান ছিলেন আইজ়েনকোট। ২০২৩ সালে গাজ়ার লড়াইয়ে ছেলে ও দুই ভাগ্নেকে হারান তিনি। সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযত ব্যক্তিত্ব ও শীর্ষ সেনা অফিসার পরিচয়ের জেরে ‘বিবি’র প্রতি মোহভঙ্গ হওয়া ভোটারদের সঙ্গে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে তাঁর।
১০ / ১৬
তবে, কুর্সি পেলেই আইজ়েনকোট তড়িঘড়ি যুদ্ধ বন্ধ করবেন, এই ধারণা বেশ কষ্টকল্পিত। কারণ, প্যালেস্টাইনের চরম বিরোধী হিসেবেও ইজ়রায়েলে তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। তা ছাড়া, হামাসের সামরিক সক্ষমতা ভাঙতে চান সাবেক আইডিএফ প্রধান। কোনও অবস্থাতেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেবেন না তিনি। ফলে, প্রধানমন্ত্রী হলে ‘বিবি’র চেয়েও আক্রমণাত্মক নীতি নিতে দেখা যেতে পারে তাঁকে।
১১ / ১৬
আইজ়েনকোটের নির্বাচনী প্রচারে ইতিমধ্যেই মিলেছে সেই ইঙ্গিত। ইজ়রায়েলের সামরিক নিরাপত্তা নীতি পরিত্যাগের কোনও প্রতিশ্রুতি দেননি তিনি। ২০০৬ সালে লেবাননের হিজ়বুল্লার বিরুদ্ধে আইডিএফ-এর অভিযান চলাকালীন ‘দাহিয়ান মতবাদ’ প্রচার করতে দেখা যায় তাঁকে। যেখানে ইরান মদতপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীটির আক্রমণের জবাবে বিপুল ফৌজি শক্তি প্রয়োগের সমর্থনে একাধিক যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
১২ / ১৬
তা ছাড়া, ইরান প্রশ্নেও ‘বিবি’র নীতির থেকে আইজ়েনকোটের চিন্তাভাবনা খুব একটা আলাদা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই শিয়া ধর্মগুরু পরিচালিত তেহরানের ‘ইসলামীয় প্রজাতন্ত্র’-এর পতন চাইছেন নেতানিয়াহু। এ বছরের অক্টোবরের গোড়ার দিকে একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সে কথা বলতেও শোনা যায় তাঁকে। সম্প্রতি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খোলেন ‘ইয়াশার’-এর শীর্ষ নেতা। সাবেক পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ষোলআনা ইচ্ছা আছে তাঁর।
১৩ / ১৬
ইরান ইস্যুতে আইজ়েনকোট বলেছেন, ‘‘আমাদের যে কোনও প্রকারে তেহরানকে পরমাণু হাতিয়ার তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে হবে। সেটি হয় বলপ্রয়োগে করে, নয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া কোনও চুক্তির মাধ্যমে।’’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ যদিও মনে করেন, ক্ষমতা পেলে হয়তো খুব দ্রুত সাবেক পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবেন না আইডিএফ-এর প্রাক্তন শীর্ষকর্তা। তবে, লড়াইয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি তিনি।
১৪ / ১৬
তা ছাড়া, শপথগ্রহণের ১৮ মাসের মধ্যেই প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকা থেকে হামাসকে উপড়ে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজ়েনকোট। ইজ়রায়েলি গণমাধ্যম ‘চ্যানেল-৭’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’ কাঠামো ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে, সেটি ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া যে উপায় নেই, তাও স্বীকার করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
১৫ / ১৬
সামরিক প্রশ্নে একটি বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে আইজ়েনকোটের। মার্কিন সাহায্য নিয়ে ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে চান ‘বিবি’। সেখানে সাবেক আইডিএফ প্রধান গোটা অভিযানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখার পক্ষপাতী। ইহুদি রাষ্ট্রটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্য খোলা সমর্থন জানিয়েছেন ট্রাম্প। অন্য দিকে, বিদেশে বসবাস করা বহু ইজ়রায়েলি ভোটে অংশ নিতে তেল আভিভ-মুখো হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
১৬ / ১৬
বিশ্লেষকদের দাবি, নেতানিয়াহু বা আইজ়েনকোট, ইজ়রায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী যেই হোন না কেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ, গত কয়েক বছরে সামরিক প্রশ্নে আরও কাছাকাছি এসেছে নয়াদিল্লি ও তেল আভিভ। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যে ১৫০ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ ইহুদি রাষ্ট্রটিকে সরবরাহ করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
সব ছবি: সংগৃহীত।
