বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপান দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অংশীদার। অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে দেশটির সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে জাইকা, দেশটির ব্যবসায়ী নেতৃত্ব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর সঙ্গে বৈঠকগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন আলোচনার সাফল্যকে বাস্তব উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমানের উন্নতিতে রূপ দেওয়া।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বর্তমানে জ¦ালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব মোকাবিলায় জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জাপানের সহযোগিতার হাত বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, সেই অর্থ ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। তবেই এর সুফল ভোগ করতে পারবে জাতি।
জাইকার সঙ্গে বৈঠকে চলমান মেগা প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পের প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বড় প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয়বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়সীমা, ব্যয় ও অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি বিনিয়োগের সুফল, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ-জাপান স্কিলস পার্টনারশিপ’ দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। জাপানের কারিগরি শিক্ষা ও শিল্পপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তরুণদের প্রশিক্ষিত করা গেলে দেশীয় শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে। একইভাবে প্রস্তাবিত ‘টেকনোলজিক্যাল ভিলেজ অ্যান্ড ইনোভেশন সিটি’ যেন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে। গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগকে এর মূল লক্ষ্য করতে হবে।
কৃষি আধুনিকীকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অপচয় হ্রাস এবং রপ্তানির নতুন ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ রয়েছে। কাফকোর আধুনিকায়ন ও দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তবে গ্যাসের প্রাপ্যতা, উৎপাদন ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জ¦ালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণেও জাপানের প্রযুক্তি কাজে লাগানো যেতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, আইনের নির্ভরযোগ্য প্রয়োগ এবং নিরবচ্ছিন্ন জ¦ালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো ও আইনি সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তারও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাপানের সহযোগিতায় নেওয়া প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সমঝোতা স্মারক, ঋণচুক্তি কিংবা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নয়, প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করতে হবে বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনজীবনে তার প্রভাব দিয়ে।
জাপানের পুঁজি, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ জনশক্তি ও উৎপাদন সম্ভাবনার সমন্বয় ঘটাতে পারলে উন্নয়নের নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে। এ জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, নির্ধারিত সময়সীমা এবং ফলভিত্তিক বাস্তবায়ন। তবেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কূটনৈতিক সৌজন্যের গ-ি পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।