এক যে ছিল দেশ, তার নাম কুমন্দ্রা। অনেক অনেক দিন আগের কথা, সে দেশে মানুষ ও মায়াবী ড্রাগনরা মিলেমিশে সুখে থাকত। কিন্তু হঠাৎ করেই সেখানে নেমে এলো কালো ছায়া। সেখানে শুরু হলো এক অশুভ শক্তির উত্থান, যার নাম ড্রুন। এই ড্রুন যাকে ছুঁয়ে দিত, সে মুহূর্তের মধ্যে পাথরে পরিণত হয়ে যেত! সেই ভয়ংকর বিপদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে ড্রাগনদের মধ্যে একমাত্র বেঁচে থাকা শেষ ড্রাগন সিসু তার সমস্ত জাদুকরী শক্তি একটি জাদুকরী রতেœর মধ্যে রেখে দিল। সেই জাদুকরী রতেœর আলোয় ড্রুনরা পালিয়ে গেল এবং পাথরে পরিণত হওয়া সবাই আবার প্রাণ ফিরে পেল, যদিও বেচারা ড্রাগনগুলো আর বেঁচে ফিরতে পারল না।
এরপর সবকিছু ঠিকঠাক হতে পারত! কিন্তু জানো তো, মানুষের মন তো একটু লোভী হয়! লোভের বশে সেই জাদুকরী রতœটি কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে মানুষ পাঁচটা আলাদা গোত্রে ভাগ হয়ে গেল। যাদের নাম দেওয়া হয়Ñ ফ্যাং, হার্ট, স্পাইন, ট্যালন আর টেইল।
এরপর কেটে যায় পাঁচশ বছর। হার্ট গোত্রের প্রধান, যার নাম ছিল চিফ বেনজা, তিনি সেই রতœটি নিজের কাছে যতœ করে রাখলেন। এদিকে তার ছোট্ট মেয়ে রায়াকে একজন দারুণ সাহসী যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুললেন। তার আগে জানিয়ে রাখি, রায়াই হলো আমাদের গল্পের মূল চরিত্র। রায়ার একটা ভীষণ বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল যার নাম টুক টুক। টুক টুক দেখতে একটা গোলগাল বলের মতো। আর তার ওপর চড়েই রায়া চারপাশে ছুটে বেড়াত। এভাবেই একদিন রায়ার বাবা পাঁচ গোত্রের প্রধানদের একসঙ্গে ডেকে একটা শান্তির ভোজসভার আয়োজন করলেন। সেখানে রায়ার সঙ্গে পরিচয় হলো ফ্যাং গোত্রের রাজকন্যা নামারির সঙ্গে। নামারি রায়াকে ড্রাগনের একটা সুন্দর নেকলেস উপহার দিল এবং রায়া তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে রতেœর গোপন কক্ষে নিয়ে গেল। কিন্তু ওটা ছিল নামারির প্রতারণা! নামারি রতœটি চুরি করার চেষ্টা করলে অন্য গোত্রের প্রধানরা সেখানে চলে আসে এবং কাড়াকাড়ির একপর্যায়ে রতœটি ভেঙে পাঁচ টুকরো হয়ে যায়। রতœ ভাঙতেই সেই ভয়ংকর ড্রুন শক্তি আবার চারদিক থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এমন মুহূর্তে চিফ বেনজা রায়াকে বাঁচানোর জন্য নদীতে ছুড়ে ফেলে দিলেন এবং নিজে ড্রুনের আক্রমণে পাথরে পরিণত হলেন।
বাবাকে হারিয়ে একা হয়ে যাওয়া রায়া তখনই মনে মনে পণ করল যে, সে ওই রতেœর সবগুলো টুকরো খুঁজে বের করবে এবং শেষ ড্রাগন সিসুকে ডেকে তুলবে। দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ ছয়টি বছর। একদিন টেইল গোত্রের গোপন গুহায় গিয়ে রায়া ভুলবশত জাদুকরী বাদ্য বাজিয়ে শেষ ড্রাগন সিসুকে ডেকে তুলল। সিসু তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করে রায়ার সঙ্গে বেরিয়ে আসে! সিসু রায়াকে জানায় যে, সে একা ওই রতœ তৈরি করেনি, বরং তার ভাইবোনেরা জাদুকরী শক্তি দিয়েছিল। এরপর রায়া আর সিসু মিলে রতেœর বাকি টুকরোগুলো উদ্ধারের অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। সেই যাত্রায় তাদের সঙ্গে একে একে যোগ দিল একদল নতুন সঙ্গী। তারা হলো, রেস্তোরাঁ মালিক বাউন, চতুর শিশু নোই, স্পাইন গোত্রের বিশালকায় যোদ্ধা টং।
পথ চলতে চলতে তারা চার গোত্র থেকে একে একে রতœগুলো উদ্ধার করতে লাগল, আর রতœ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিসু তার ভাইবোনদের জাদুকরী ক্ষমতাও ফিরে পেতে লাগল। একসময় তারা পৌঁছাল ফ্যাং গোত্রের কাছে। সিসু রায়াকে খুব সুন্দর করে বোঝাল যে শক্তি দিয়ে নয়, কেবল বিশ্বাস দিয়েই নামারির মন জয় করা সম্ভব। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে রায়া নামারিকে সেই ছোটবেলার ড্রাগন নেকলেসটি ফিরিয়ে দিল। কিন্তু ফ্যাং গোত্রের প্রতি দায়িত্বের টানে নামারি দ্বিধায় পড়ে গেল এবং ধনুক তাক করে তাদের আটকে রাখল। নামারির আঙুলের সামান্য নড়াচড়া দেখে রায়া ভয় পেয়ে হামলা চালাল, আর অমনি নামারির ধনুক থেকে তীর ফসকে সরাসরি গিয়ে লাগল সিসুর গায়ে! সিসু মারা গেল! সিসুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই কুমন্দ্রার সমস্ত নদীর পানি শুকিয়ে গেল আর ড্রুনরা আবার চারপাশ থেকে তেড়ে এলো।
যখন চারদিক একদম অন্ধকার হয়ে গেল আর সবাই পাথরে পরিণত হওয়ার উপক্রম হলো, তখন রায়ার মনে পড়ল সিসুর সেই শেষ কথাটাÑ বিশ্বাসের অভাবই জগতকে ধ্বংস করে, কিন্তু বিশ্বাসই পারে জগতকে বাঁচাতে। নিজের ভেতরের সব অবিশ্বাস দূর করে রায়া নিজের কাছে থাকা রতেœর টুকরোটি নামারির হাতে তুলে দিল এবং স্বেচ্ছায় ড্রুনের সামনে গিয়ে পাথরে পরিণত হলো! রায়ার এই মহান ত্যাগে মুগ্ধ হয়ে বাউন, টং আর নোইও নিজেদের টুকরোগুলো সমর্পণ করে একে একে পাথর হয়ে গেল। তখন নামারি সেই টুকরোগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগাল। রতœটি সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাদুকরী আলোয় সমস্ত ড্রুন চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল এবং পাথরে পরিণত হওয়া সমস্ত মানুষ ও জীবজন্তু আবার প্রাণ ফিরে পেল। এমনকি সিসুসহ সব ড্রাগনরাও ফিরে এলো! বাবা বেনজাকেও সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়ে রায়া আনন্দের কান্নায় ভেঙে পড়ল। অবশেষে সব গোত্র তাদের পুরোনো শত্রুতা ভুলে নতুন ও ঐক্যবদ্ধ কুমন্দ্রা হিসেবে একসঙ্গে সুখে বসবাস শুরু করল।
চমৎকার এই গল্পটি ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া এনিমেশন সিনেমা রায়া অ্যান্ড দ্য লাস্ট ড্রাগনের। সিনেমাটি প্রযোজনা করেছিল বিখ্যাত ওয়াল্ট ডিজনি অ্যানিমেশন স্টুডিওস। ছবিটির পেছনে কাজ করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, তাদের মারামারি শিল্প এবং সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদের দারুণ এক ছোঁয়া। কোভিডের কারণে প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি ডিজনি প্লাস প্ল্যাটফর্মেও এটি মুক্তি পেয়েছিল। সুন্দর ভিজ্যুয়াল ও আবেগময় গল্পের জন্য ছবিটি অস্কারের সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল। এই গল্পটিতে খুব সুন্দর একটি শিক্ষা রয়েছে। আমরা যদি সবসময় সবাইকে অবিশ্বাস করি এবং মনের দরজায় ভয়ের খিল লাগিয়ে রাখি, তবে জীবনে কখনো প্রকৃত বন্ধু পাওয়া যায় না। কিন্তু একটুখানি বিশ্বাস, ক্ষমা আর ভালোবাসা থাকলে যেকোনো কঠিন শত্রু বা বিপদকেও সহজেই আপন করে জয় করা সম্ভব।
