চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। অসুস্থ হলে মানুষ প্রথমেই প্রত্যাশা করে, নিজের দেশেই উপযুক্ত চিকিৎসা পাবে, সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি থাকলে সামর্থ্যবান মানুষ বিদেশের হাসপাতালমুখী হয়। এর পেছনে জটিল রোগের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দেশীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটও বড় কারণ। এই সংকট কাটাতে হলে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মান, জবাবদিহি ও রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশের দুই নাগরিকের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা নিয়ে বিদেশে গিয়ে একজন রোগী জানতে পেরেছেন, দেশের চিকিৎসকেরা যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেখানকার চিকিৎসকরাও প্রায় একই কথা বলেছেন। অন্য একজন কোমরের ব্যথার সমাধান খুঁজতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও পেয়েছেন ব্যায়াম ও ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট, বিদেশে গেলেই যে রোগের নিশ্চিত সমাধান মিলবে, তা নয়। অথচ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব তাদের বিদেশে যেতে এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশীয় চিকিৎসকদের দক্ষতা ও চিকিৎসার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের মনে এই অনাস্থা কেন তৈরি হচ্ছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা প্রতি বছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেন। এই অর্থের একটি বড় অংশ দেশে থাকলে বিশেষায়িত হাসপাতাল, আধুনিক পরীক্ষাগার, গবেষণা এবং চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতো। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমত।
এ ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা ও চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা। একই রোগের জন্য বারবার পরীক্ষা, পরস্পরবিরোধী পরামর্শ কিংবা চিকিৎসার ফল সম্পর্কে অস্পষ্টতা রোগীর আস্থা নষ্ট করে। তাই হাসপাতাল ও পরীক্ষাগারগুলোর মান নিয়মিত যাচাই, পরীক্ষার ফলের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত এবং প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত নেওয়ার সুযোগ সহজ করতে হবে।
একই সঙ্গে হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি, লিভার, স্নায়ুরোগ ও জটিল অস্ত্রোপচারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দেশের সক্ষমতা কোথায় কতটা সীমিত, তার বাস্তব মূল্যায়ন প্রয়োজন। যেসব চিকিৎসায় বিদেশের ওপর নির্ভরতা বেশি, সেসব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, চিকিৎসা গবেষণা এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয়, পরীক্ষার মান এবং চিকিৎসাসেবার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দেশের সব রোগের চিকিৎসা এখনই দেশীয় ব্যবস্থায় নিশ্চিত করা সম্ভব না-ও হতে পারে। কিছু জটিল রোগে বিদেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন থাকবে। কিন্তু সাধারণ ও বহুল প্রচলিত রোগের চিকিৎসা, নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবার জন্য মানুষকে যেন আস্থাহীনতায় ভুগতে না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।
আমরা মনে করি, দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা তাই শুধু স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও প্রশ্ন। চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনর্গঠনে সরকারকে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে। দেশেই মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বিদেশমুখী প্রবণতা কমবে, মানুষের অর্থ সাশ্রয় হবে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি হারানো আস্থা ফিরে আসবে।