জীবনের একই ঝড় কারও মন ভেঙে দেয়, আবার কাউকে করে তোলে আরও দৃঢ় ও অবিচল। কেউ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও মনের শান্তি খুঁজে পান না, আবার কেউ সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তৃপ্তি, কৃতজ্ঞতা ও প্রশান্তিতে জীবন কাটান। জীবনের এই বৈপরীত্যের পেছনে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, অন্তরের বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হলো—সুখের সময়ে শোকর এবং দুঃখের সময়ে সবর মুমিনের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। পবিত্র মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদের দেওয়া জুমার খুতবায়ও উঠে এসেছে ঈমানের মাধুর্য, আল্লাহর প্রতি আস্থা এবং তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার এই তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।
ঈমানের মাধুর্যেই অন্তরের প্রশান্তি
একই পরিস্থিতিতে পড়ে কেউ হতাশায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ প্রতিকূলতার মধ্যেও অবিচল থাকেন। কারও জীবনে প্রাচুর্য ও সুযোগ-সুবিধার অভাব নেই, তবু তাঁর অন্তরে অশান্তি, অভিযোগ ও অসন্তুষ্টি বিরাজ করে। অন্যদিকে, কেউ সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তৃপ্তি ও প্রশান্তির সঙ্গে জীবনযাপন করেন। এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ হিসেবে ঈমানের মাধুর্য ও আল্লাহর প্রতি মানুষের আস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ।
পবিত্র কাবা শরিফের জুমার খুতবায় তিনি মানুষের অন্তরের প্রশান্তি, জীবনের নানা পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি মানুষের জীবনযাপন ও মানসিক অবস্থার পার্থক্য ব্যাখ্যা করে বলেন, কিছু মানুষ প্রশস্ত হৃদয়, শান্ত মন ও সন্তুষ্টি নিয়ে জীবন কাটান। বিপরীতে, পর্যাপ্ত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেকে অভিযোগ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও অসন্তুষ্টিতে নিমজ্জিত থাকেন। এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ হলো ঈমানের মাধুর্য— যা মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আল্লাহকে স্রষ্টা ও রিজিকদাতা হিসেবে বিশ্বাস করা, বিপদে তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তরে প্রশান্তি আসে। দৃঢ় ঈমান মানুষকে ভয়, হতাশা ও অস্থিরতা মোকাবিলা করার শক্তি জোগায়।
কুরআনের আলোকে অন্তরের প্রশান্তি
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁর স্মরণের মধ্যেই অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি নিহিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রা‘দ: আয়াত ২৮)
এই আয়াত মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দেয়, বাহ্যিক প্রাচুর্য কিংবা জাগতিক সাফল্যই অন্তরের শান্তির একমাত্র উৎস নয়। বরং আল্লাহর স্মরণ, তাঁর প্রতি বিশ্বাস এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রাখার মধ্য দিয়েই মানুষ অন্তরের প্রশান্তি খুঁজে পেতে পারে।
সুখে শোকর, দুঃখে সবর—মুমিনের জীবনের সৌন্দর্য
খুতবায় শায়খ সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ মুমিনের জীবনে কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর আলোচনার মূল শিক্ষা হলো, সুখ ও প্রাচুর্যের সময়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আর অভাব, বঞ্চনা, দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদের সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
সবর মানে শুধু কষ্ট নীরবে সহ্য করা নয়; বরং বিপদের মধ্যেও আল্লাহর প্রতি আস্থা বজায় রাখা, হতাশায় হার না মানা এবং সঠিক পথে অবিচল থাকা। একইভাবে, শোকর শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্বীকার করা এবং তা সৎ ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস প্রাসঙ্গিক।
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
‘মুমিনের ব্যাপারটি কতই না বিস্ময়কর! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। তার সুখের কিছু ঘটলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর তার দুঃখ-কষ্টের কিছু ঘটলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা-ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
এই হাদিসে মুমিনের জীবনের একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। সুখ তাকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ করে, আর দুঃখ তাকে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শিক্ষা দেয়। ফলে জীবনের উত্থান-পতনেও সে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার চেষ্টা করে।
সৎকাজ, তওবা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব
খুতবায় সৎকাজের নির্দেশ পালন এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। কোনো ভালো কাজের নির্দেশ পেলে তা পালনে এগিয়ে আসা, অন্যায় থেকে নিষেধ করা হলে তা পরিহার করা এবং কোনো গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া—এসবই একজন মুমিনের জীবনচর্চার অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَسَارِعُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৩)
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, মুমিনের জীবন শুধু ধৈর্য ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমা লাভের চেষ্টা, সৎকাজে অগ্রসর হওয়া এবং আত্মশুদ্ধির ধারাবাহিক প্রচেষ্টাও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ইমানের দুর্বলতা বাড়ায় অসন্তুষ্টি, দৃঢ়তা শেখায় ভারসাম্য
খুতবায় সতর্ক করা হয়, ঈমানের দুর্বলতা মানুষের চিন্তা, আচরণ ও নৈতিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে হিংসা, স্বার্থপরতা, অভিযোগ ও অসন্তুষ্টি বাড়তে পারে। মানুষ তখন অন্যের প্রাপ্তি দেখে ঈর্ষান্বিত হয়, নিজের নিয়ামতকে অবমূল্যায়ন করে এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলে।
অন্যদিকে, দৃঢ় ঈমান মানুষকে প্রতিকূলতার মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়। আল্লাহর ওপর ভরসা তাকে হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেয় না; কৃতজ্ঞতা তাকে অহংকার থেকে দূরে রাখে, আর ধৈর্য তাকে বিপদের সময়ে সংযত থাকতে সাহায্য করে।
তবে ইমানের শক্তি থাকার অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ কখনো দুঃখ পাবেন না বা মানসিক কষ্ট অনুভব করবেন না। বরং ইমান তাকে কষ্টের মধ্যেও আশার আলো খুঁজতে, আল্লাহর সাহায্য চাইতে এবং সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
আতিকা নামের সাহসী মুসলিম নারীর প্রসঙ্গ
খুতবায় হজরত ওমর (রা.)-এর সময়কার আতিকা নামের এক সাহসী মুসলিম নারীর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। তার বক্তব্যের মর্ম ছিল এমন— আল্লাহর প্রতি তার ইমান অটুট থাকলে দুনিয়ার কোনো বিপদই তার প্রকৃত ক্ষতি করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গের মাধ্যমে ইমানের দৃঢ়তা এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।
এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো, একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি শুধু বাহ্যিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস, তার ওপর ভরসা এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে বিপদের মুখেও সাহসী করে তুলতে পারে।
প্রকৃত সুখ কোথায়?
শাইখ সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদের আলোচনার মূল বার্তা হলো— প্রকৃত সুখ কেবল সম্পদ, আরাম-আয়েশ কিংবা বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তার ওপর ভরসা, ইসলামের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসরণ মানুষের জীবনে তৃপ্তি ও প্রশান্তি এনে দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
‘প্রাচুর্য অধিক সম্পদের মালিক হওয়ার নাম নয়; বরং প্রকৃত প্রাচুর্য হলো অন্তরের প্রাচুর্য।’ (বুখারি ৬৪৪৬, মুসলিম ১০৫১)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, সম্পদ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, কিন্তু শুধু সম্পদের পরিমাণ দিয়ে অন্তরের তৃপ্তি নিশ্চিত করা যায় না। অন্তরের প্রাচুর্য হলো যা পেয়েছি তার মূল্য উপলব্ধি করা, অন্যের প্রতি হিংসা না করা, আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে তার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
জীবনে সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং সাফল্য-ব্যর্থতা আসবেই। কোনো মানুষের জীবনই সব সময় একরকম থাকে না। কিন্তু পরিস্থিতি যেমনই হোক, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা, বিপদে ধৈর্য এবং সুখে কৃতজ্ঞতা মানুষকে জীবনের পথে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে।
তাই প্রশান্তির সন্ধানে শুধু সম্পদ ও বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে ছুটলেই চলবে না; যত্ন নিতে হবে অন্তরেরও। নিয়মিত আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, দোয়া, সৎকাজ, তওবা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ইমানকে দৃঢ় করার চেষ্টা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সুখের সময়ে শোকর আর দুঃখের সময়ে সবর—এই দুই গুণই মুমিনের জীবনে কল্যাণের দরজা খুলে দেয়। জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারাই অন্তরের প্রশান্তি অর্জনের অন্যতম পথ।
সূত্র: দ্য গেট টু হারামাইন।