সরকারি প্রতিনিধি দল ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তিন ঘণ্টার বৈঠকেও সমঝোতা না হওয়ায় রাঙামাটির সাজেকে চলমান সংকট কাটছে না। তবে আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি নিয়ে দুপক্ষই সম্মত হলেও চার নম্বর দফায় আটকে যায় আলোচনা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রথম বারের মতো সংকট নিরসনে রাঙামাটি থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভুঁইয়া ও সাবেক পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির দুই জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সাজেক উজোবাজারে যান।
সাজেক উজোবাজারে বিকেল সোয়া তিনটার দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়ে চলে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী। বৈঠকে আন্দোলনকারী সংগঠন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা ও ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। পরে রাত হয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার শংকায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ফিরে আসেন সরকারি প্রতিনিধি দল।
আরও পড়ুন
আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া খাগড়াছড়ির সাংসদ ওয়াদুদ ভুঁইয়া ও সাবেক পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলছেন- ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। চার দফায় সমঝোতা হয়েছে। আশা করি অমীমাংসিত এক দফায়ও সমাধান হবে।’
তবে, ৫ দফা দাবি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবু ধন চাকমা। তিনি সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আরও পড়ুন
চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে ‘সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় জেএস এস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে অতি দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে হবে।’ তবে এই দাবি বাস্তবায়ন নিয়ে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চান সরকার পক্ষ। কিন্তু কেবল তিনদিনের সময় দিতে সম্মত হন আন্দোলনকারীরা।
পরে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, পাঁচ দাবির মধ্যে চারটির সমঝোতা হয়েছে। আরেকটা বিষয়ে একটু বাকী আছে। রাত হয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সেজন্য ওখানে আমরা আর আলোচনা করি নাই। আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যেই বাকী পয়েন্টটা আলোচনা করে সমাধানের দিকে যাবে। সড়কের অবরোধ উঠে যাবে।’
সাবেক পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি বলেন- ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। চুল চেরা বিশ্লেষণ হয়েছে। একটা পয়েন্ট আছে যেটা অমীমাংসিত। আশা করি এটাও সমাধান হবে। ওনারাও শান্তি চান, আমরাও শান্তি চাই।’
এদিকে, রাতে ভিডিও বার্তায় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবু ধন চাকমা বলেন- ‘৫ দফা দাবির মধ্যে সরকার পক্ষ চারদফায় সম্মত হয়েছেন। বাকী এক দফার জন্য আমরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত আছি। তবে পাঁচ দফা দাবি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। এ সময়ে সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণে না আসার জন্য নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।’
এর আগে সাজেক সংকট নিয়ে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় হেডম্যান ও কার্বারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান। সভায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বেলা ১১টায় শুরু হওয়া ওই সভায় সাজেকে সাম্প্রতিক ঘটনায় গঠিত সার্চ কমিটির তিন সদস্য সিএইচটি হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা ও লংগদু উপজেলা হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা কল্যাণ মিত্র চাকমা বক্তব্য রাখেন।
সভায় সাজেকে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, এর সূত্রপাত, আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়া এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে সাজেকের পর্যটন খাত সচল রাখা, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য বজায় রাখা এবং পরিবহণসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়।
এদিকে, রাঙামাটির সাজেক সড়কে পঞ্চম দিন অতিবাহিত হয়েছে ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত দুই সংগঠনের অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধে। বন্ধ রয়েছে পর্যটক প্রবেশ ও যানবাহন চলাচলও। এতে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা, স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল রিসোর্ট ও পরিবহণসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
সাজেক সংকট নিরসনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য রবিবার (২৫ অক্টোবর) গঠিত তিন সদস্যের সার্চ কমিটি কাজ শুরু করে। এরপরই সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সাজেক পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা আর দখল হাতছাড়া এলাকা পুনরুদ্ধার করা নিয়ে সন্তুলারমার জেএসএস ও প্রসিত খীসার ইউপিডিএফের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সংঘাত চলছে। এর জেরেই জেএসএসকে সাজেক থেকে তাড়িয়ে দিতে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পর্যটকদের জিম্মির চেষ্টা করে এবং কৌশল হিসেবে গত ১১ ও ১৫ অক্টোবর দুই দফায় সাজেক সড়ক অবরোধ ডাক দেন আন্দোলনকারীরা।
জুয়েল/নাঈম
