বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও বাড়েনি মানুষের আয়। সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে ক্রেতারা কমিয়ে দিয়েছেন কেনাকাটা, আর প্রয়োজন মেটাতে অনেকেই ঝুঁকছেন বাকির দিকে। এতে পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান, চায়ের দোকান ও ছোট খাবারের হোটেলগুলোতে একদিকে কমছে বিক্রি, অন্যদিকে আটকে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের পুঁজি। প্রতিদিনের বিক্রির টাকা দিয়ে পরদিনের মালামাল কেনার যে চক্রে চলে ক্ষুদ্র ব্যবসা, পাওনা আদায় না হওয়ায় তা ভেঙে পড়ছে। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন অনেক খুচরা ব্যবসায়ী।
দোকানের খাতায় ক্রেতাদের নাম ও পাওনার অঙ্ক বাড়লেও নগদ টাকার দেখা মিলছে না। পরিচিত ক্রেতাদের বাকি দিতে গিয়ে অনেক দোকানিকে এখন পাইকারি বাজারের দেনা, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেউ কেউ ব্যবসার পুঁজি ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাচ্ছেন।
যাত্রাবাড়ি এলাকার মোয়াজ্জেল স্টোরের আবুল কামাল বলেন, এখন প্রায় সব পণ্যের দাম বেশি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খরচ অনেক বেড়েছে। পুঁজি বেশি লাগছে, অথচ বিক্রি আগের চেয়ে কম। বাকিতে বিক্রি করায় টাকাও আটকে যাচ্ছে। এভাবে ব্যবসা চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি জানান, খুচরা ব্যবসায় পণ্যের লাভ খুবই সীমিত। পাঁচ লিটার তেল পাইকারি বাজার থেকে ৯৯০ থেকে ৯৯৫ টাকায় কিনে এক হাজার টাকায় বিক্রি করলে লাভ থাকে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা। এই সামান্য লাভ দিয়ে দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও সংসারের খরচ মেটানো কঠিন। এর মধ্যে বাকির টাকা আটকে গেলে নতুন করে পণ্য কেনার অর্থও থাকে না।
আরিফ আহমেদ বলেন, বাকির একটি বড় অংশ আর ফেরত পাওয়া যায় না। আবার বাকি না দিলেও ক্রেতা পণ্য কিনবেন না। তখন দোকানে নতুন মাল তুলব কী করে? বাধ্য হয়ে অনেক দোকানদারকে পুঁজি ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই বিপদে আছে।
শরীয়তপুরের আক্তার হোসেন বলেন, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিরা দোকানে এসে বাকি চাইলে সম্পর্কের কারণে না বলা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু পাওনা টাকা চাইতে গেলে অনেক সময় মনোমালিন্য তৈরি হয়।
রহিম আলী জানান, এখনো বাকির খাতায় কয়েক লাখ টাকা আটকে আছে, যা কোনোভাবেই তোলা যাচ্ছে না। মাস শেষে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও নিজেদের খরচ পরিশোধ করতে হয়। সময়মতো পাওনা না পেলে ব্যবসার পুঁজি দিন দিন ছোট হয়ে আসে। তার আশঙ্কা, বিক্রি কমে যাওয়া এবং পাওনা আদায়ের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসার এই সংকটের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সামগ্রিক চাহিদা ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, অর্থনৈতিক পরিভাষায় বর্তমান পরিস্থিতিকে সামগ্রিক চাহিদা বা ‘অ্যাগ্রিগেট ডিমান্ড’ কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যায়। নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি ও সরকারের সম্মিলিত ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে এই চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমানে চাহিদা কমছে এবং তা কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, করের চাপ হ্রাস ও সুদের হার কমানো জরুরি। মানুষের আয় ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে নিশ্চয়তা তৈরি না হলে তারা ব্যয় বাড়াতে উৎসাহিত হবেন না। একইভাবে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকলে উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না।
অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিমের মতে, উচ্চ সুদের হার, করের বোঝা এবং জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ব্যবসার পরিচালন খরচ বাড়াচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য ব্যয় বহন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ছে। এসব ব্যয় কমানো গেলে খুচরা বাজারেও পণ্যের দামের ওপর চাপ কমতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান জোর করে কমানোর পরিবর্তে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুদের হার ও করের চাপ কমানো এবং জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দরকার।
পাড়া-মহল্লার ক্ষুদ্র দোকানগুলো শুধু পণ্য বিক্রির কেন্দ্র নয়, এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মচারী, সরবরাহকারী ও তাদের পরিবারের জীবিকা। বিক্রি কমা, পাওনা আটকে থাকা এবং পরিচালন ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে এসব ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
