বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের জন্য পাচার করা হয়েছে। তাঁদের অনেককে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে তাঁদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।
ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিককে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা তদন্ত করে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে। ভুক্তভোগীদের সবাই পুরুষ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষ।
বাংলাদেশি এক ভুক্তভোগীর স্ত্রীর বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, তাঁর স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে তাঁকে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। চুক্তিটি ছিল শুধু রুশ ভাষায়। প্রচণ্ড চাপের মুখে তাঁর স্বামীর সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশের নিয়োগকারী এজেন্ট ও সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে রাশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাশিয়ার নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
চাকরিপ্রত্যাশীদের বিশ্বাস অর্জনে এজেন্টরা আমন্ত্রণপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখাত। পরে ভিসা, উড়োজাহাজের টিকিট ও ভ্রমণের ব্যবস্থা করে তাঁদের রাশিয়ায় পাঠানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এজেন্টরা তাঁদের সঙ্গে রাশিয়ায়ও যেত।
বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিশন রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কাগজপত্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে দেখানো হলেও কমিশনের সামগ্রিক তদন্তে এ ধরনের ব্যবস্থার আড়ালে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বিদেশি নাগরিককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। চুক্তি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অনেকে এর শর্ত বুঝতে পারেননি। কারও কারও পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতাও সীমিত করা হয়। পরে তাঁরা জানতে পারেন, বেসামরিক চাকরির পরিবর্তে তাঁদের রুশ বাহিনীতে কাজ করতে হবে।
নিয়োগের পর এসব ব্যক্তির অনেককে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বিপজ্জনক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁদের কেউ নিহত, আহত, বন্দি কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। স্বজনের খোঁজ না পাওয়া, মৃত্যুসংবাদ পেয়েও মরদেহ দেশে ফেরাতে না পারা এবং ঋণের বোঝায় বিপাকে পড়েছেন অনেক পরিবারের সদস্য। চাকরির আশায় কেউ কেউ নিয়োগ ফি দিয়েছেন। অনেকে ঋণ করেছেন বা সম্পদ বিক্রি করেছেন।
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া ও কেনিয়াসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিয়োগের ঘটনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কমিশন বলেছে, বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগে বিভিন্ন দেশে সক্রিয় চক্রের সঙ্গে রুশ কর্তৃপক্ষের উচ্চমাত্রার সমন্বয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এবং জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর ঘটনাগুলো মানবপাচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রতিবেদনে রাশিয়াকে এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মুক্ত করতে রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রতারণামূলক নিয়োগ ঠেকাতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে।
আগেও সতর্ক করেছিল ব্র্যাক
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর বিষয়টি আগেও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক গবেষণা প্রতিবেদনেও এ ধরনের ঘটনার কথা বলা হয়। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভালো বেতনের চাকরির আশায় বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর বাংলাদেশিদের সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনটিতে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ, ভুক্তভোগীদের উদ্ধার এবং সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশি নাগরিকদের মোট কতজনকে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে, তা প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং নিখোঁজ বা আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্তে আরও তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।
