একদিন যে ছেলেকে ‘অ্যাথলেটিক সক্ষমতা নেই’ বলে ফিরিয়ে দিয়েছিল আর্সেনাল, সেই ছেলেই একদিন হয়ে উঠলেন ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। টটেনহ্যামে গড়েছেন ইতিহাস, বায়ার্ন মিউনিখে গিয়ে জিতেছেন শিরোপা। আর ৩৩ বছর বয়সে তার হাতে উঠেছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর।
কল্পনা করুন, ফুটবল খেলতে ভালোবাসে একটি ছোট্ট ছেলে। তার স্বপ্ন একদিন বড় ফুটবলার হবে। হাজারো শিশুর মতো সেও ছুটে বেড়ায় মাঠে, বল নিয়ে কাটায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একদিন সুযোগও পেয়ে যায় ইংল্যান্ডের অন্যতম বড় ক্লাব আর্সেনালের একাডেমিতে। মনে মনে হয়তো এঁকে ফেলেছিল নিজের ভবিষ্যতের ছবিটা। কিন্তু সেই স্বপ্নের শুরুতেই নেমে আসে ধাক্কা। মাত্র আট বছর বয়সে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই ক্লাবে তার জায়গা নেই। কারণ? সে নাকি একটু বেশিই মোটাসোটা!
ছেলেটির নাম হ্যারি কেইন। আজ সেই কেইনই ব্যালন ডি’অরজয়ী। বয়স ৩৩। একসময় যে ফুটবলবিশ্বের দরজায় দাঁড়ানোর যোগ্যতাই তার নেই বলে মনে করা হয়েছিল, আজ সেই বিশ্বই তাকে সেরার স্বীকৃতি দিয়েছে।
আরও পড়ুন
আট বছর বয়সে আর্সেনাল থেকে বাদ পড়ার ঘটনা অনেক শিশুর কাছেই হয়তো ফুটবলের প্রতি আগ্রহ হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু কেইনের গল্পে প্রত্যাখ্যানই হয়ে উঠেছিল নতুন করে শুরু করার উপলক্ষ। সেই তাগিদই তাঁকে শিখিয়েছে ধৈর্য ধরতে। শিখিয়েছে, আজ কেউ বিশ্বাস না করলেও নিজের ওপর বিশ্বাস হারানো যাবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলেই যে পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে যায় না, সেটিও বুঝিয়ে দিয়েছে তার শৈশবের সেই প্রত্যাখ্যান।
টটেনহ্যাম হটস্পারের মূল দলে জায়গা করে নেওয়ার আগে কেইনকে যেতে হয়েছে চারটি আলাদা ধারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ইংল্যান্ডের নিম্ন বিভাগের ফুটবল থেকে প্রিমিয়ার লিগ- প্রতিটি ধাপেই ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রথমে লেটন ওরিয়েন্ট, এরপর মিলওয়াল। তারপর নরউইচ সিটি, সবশেষে লেস্টার সিটি। ক্লাব বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে, বদলেছে প্রতিপক্ষও। কিন্তু বদলায়নি নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই।
আরও পড়ুন
লেটন ওরিয়েন্টে খেলেছেন ইংল্যান্ডের তৃতীয় স্তরের লিগ ওয়ানে। মিলওয়াল ও লেস্টার সিটিতে ছিলেন চ্যাম্পিয়নশিপে, আর নরউইচ সিটিতে পেয়েছেন প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা। কাগজে-কলমে এগুলো ছিল ধারে খেলার কয়েকটি অধ্যায়। এভাবেই তৈরি হয়েছে এক স্ট্রাইকার। একসময় সুযোগ এল টটেনহ্যামে। উত্তর লন্ডনের এই ক্লাবটিই হয়ে উঠল কেইনের নিজের পরিচয় গড়ে তোলার মঞ্চ।
গোলের পর গোল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন টটেনহ্যামের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে। একপর্যায়ে হয়ে উঠেছেন ক্লাবটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়েও গোলের পর গোল করে পৌঁছে গেছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে।
আরও পড়ুন
তবে সাফল্যের আলোয় দাঁড়িয়েও কেইনের গল্পে একটা অপূর্ণতা ছিল। ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিতে যোগ হচ্ছিল একের পর এক গোল, রেকর্ড আর স্বীকৃতি। কিন্তু দলীয় পর্যায়ে ফুটবলের বড় শিরোপাগুলো তখনও অধরা। টটেনহামে তাকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, অথচ কাঙ্ক্ষিত ট্রফি হাতে তোলার সুযোগ আসছিল না।
বছর পেরিয়েছে, মৌসুম এসেছে-গেছে। প্রশ্নও উঠেছে, এত গোল করেও কেইন কি বড় শিরোপা জিততে পারবেন? নাকি তার ক্যারিয়ার থেকে যাবে ব্যক্তিগত সাফল্য আর দলীয় অপূর্ণতার এক অদ্ভুত মিশেল হয়ে?
ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায় শুরু করতে ৩০ বছর বয়সে জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন কেইন। ইংলিশ স্ট্রাইকারকে দলে নিতে বায়ার্ন খরচ করে ৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। সে সময়ের হিসাবে এটি ছিল জার্মানির বুন্দেসলিগার ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলবদলের অঙ্ক।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটে ৩১ বছর বয়সে। ক্যারিয়ারের প্রথম বড় শিরোপা হাতে তোলেন কেইন। যে ট্রফির জন্য তাকে এত দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল, সেটি জয়ের মধ্য দিয়ে নিজের সমালোচকদের জবাব দেন তিনি। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশে যোগ হয় বহু আকাঙ্ক্ষিত দলীয় সাফল্য। এ যেন দীর্ঘ দৌড়ের শেষে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানো। তবে কেইনের গল্প তখনো শেষ হয়নি।
ফুটবলারের ক্যারিয়ারে ব্যালন ডি’অর এমন এক স্বীকৃতি, যার স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়েরাও। আর সেই পুরস্কারই যখন হাতে আসে ৩৩ বছর বয়সে, তখন তার তাৎপর্য হয়ে ওঠে আরও গভীর।
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন কেইন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তার অবদান মূল্যায়ন করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকেরা তাকে বেছে নিয়েছেন এই পুরস্কারের জন্য।
অনিক/
