॥ আয়েশা সিদ্দিকা ॥
দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা মন্দা ও আস্থার সঙ্কট কাটছে না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন নেমে এসেছে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে, যা একসময় দেড় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়েছিল। অক্টোবর মাসে ডিএসইর লেনদেন কমে ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে। যেমন গত ১৯ অক্টোবর লেনদেন হয়েছিল মাত্র ৫০২ কোটি টাকা। বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। ফলে ছোট বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পুঁজি তুলে নেওয়ার কথা ভাবছেন। মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারের চেয়ে ব্যাংকে নিরাপদ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। অক্টোবর মাসের প্রথম ভাগে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনও আগের তুলনায় কমে গেছে। বাজারে কারসাজি রোধে কার্যকর ও ধারাবাহিক নজরদারির অভাব এবং মনস্তাত্ত্বিক ভীতি বাজারের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। যা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা সৃষ্টি করেছে।
সার্বিক দিক বিবেচনায় কোন ভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। দৃশ্যত হিসাব বাড়ছে, কিন্তু বাজারের আকার ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। নতুন করে বিও হিসাব খুলছেন অনেকে, অথচ পুঁজিবাজারে কমছে বাজারমূলধন। যা পুঁজিবাজারে নতুন করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশের (সিডিবিএল) প্রায় ৯ মাসের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের এই পরস্পরবিরোধী চিত্র এসেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালনযোগ্য বিও হিসাব বেড়েছে ২৪ হাজার। কিন্তু একই সময়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজারমূলধন কমেছে ৩৫ হাজার ২৫৪ কোটি ৬৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। ডিএসইর প্রধান সূচকও হারিয়েছে ১১৯ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট। প্রতিদিনের লেনদেনেও বড় পতনের চিত্র। আর বিও হিসাব এক দিকে বাড়ছে, অন্য দিকে নিস্ক্রিয় বিও বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ বলে সিডিবিএলের তথ্য পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে। যা কিছুটা হলেও উদ্বেগজনক।
সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, শুধু বাজারমূলধন বা সূচকের পতন নয়, বিনিয়োগকারীদের হিসাবের অবস্থাতেও রয়েছে উদ্বেগের ইঙ্গিত। শেয়ার রয়েছে এমন বিও হিসাব বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার ৫৩০টি। অন্য দিকে নিষ্ক্রিয় বিও হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার ৫২৩টি। ব্যালেন্সশূন্য হিসাবের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৬৩টি। প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবও কমেছে ১ হাজার ১১৫টি। অর্থাৎ, হিসাবের সংখ্যা বাড়লেও বাজারের আর্থিক পরিসর ও বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্রটিতে সমান তালে উন্নতির প্রমাণ মিলছে না। প্রশ্ন উঠছে, পুঁজিবাজারে নতুন হিসাব খোলার প্রবণতা কি বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে? নাকি হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধির আড়ালে দুর্বল হচ্ছে বাজারের লেনদেনের গতি? কিন্তু এসব প্রশ্নের কারো কাছে সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি দিনের পর দিন জটিলই হচ্ছে।
পুঁজিবাজারের সামগ্রিক আকার বোঝার অন্যতম সূচক বাজারমূলধন। তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলোর শেয়ারের বাজারদরের ভিত্তিতে এই মূল্য নির্ধারিত হয়। ফলে বাজারমূলধনের পতন বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ারের সামগ্রিক বাজারমূল্যের হ্রাসের ইঙ্গিত দিতে পারে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ৯ মাসে ডিএসইর বাজারমূলধন কমেছে ৩৫ হাজার ২৫৪ কোটি ৬৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। বর্তমানে এ বাজারমূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। যা চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল সাত লাখ ১৬ হাজার ৮৪২ কোটি ৪২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সে তুলনায় বাজারমূলধন কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় নয় মাসে বাজারের মোট মূল্যের প্রায় ৫ শতাংশ ক্ষয় হয়েছে। যদিও বাজারমূলধনের পরিবর্তন মানেই বিনিয়োগকারীদের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়, তবু এই পতন বাজারের সামগ্রিক মূল্যায়নে অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
ডিএসইর তথ্য বলছে, বাজারে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। তবে লেনদেন বাড়লেই বাজার ভালো, কিংবা কমলেই বাজার খারাপ-এমন সরল সিদ্ধান্তও সব সময় সঠিক নয়। দৈনিক লেনদেন এক সময় এক হাজার ২২২ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার টাকা থেকে কমে এখন ৫০২ কোটি ৬৩ লাখ ১৬ হাজার টাকায় নেমেছে। এই দুই অঙ্কের তুলনায় পতন ৭১৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ দশমিক ১১ শতাংশ। বাজারে নতুন বিও হিসাব খোলা হলেও সেগুলোর নিয়মিত লেনদেনে যুক্ত হচ্ছে না। ফলে পুঁজিবাজারের সঙ্কট দিনের পর দিন বাড়ছে।
ঢাকা স্টকের তথ্য বলছে, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক গত প্রায় ৯ মাসে কমেছে ১১৯ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিএসইএক্স ছিল ৫৫৭০ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে, যা ১৯ অক্টোবর কমে ৫৪৫০ দশমিক ৬২ পয়েন্টে এসেছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ২২ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট। আলোচ্য সময়ে এ সূচক ছিল ২১২৬ দশমিক ২৪ পয়েন্ট এবং এখন তা ২১০৩ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে নেমেছে। প্রধান সূচক বাজারের নির্বাচিত শেয়ারগুলোর সামগ্রিক দরপরিবর্তনের একটি চিত্র দেয়। অন্য দিকে ডিএসই-৩০ সূচক বড় ও নির্বাচিত ৩০টি সংস্থার শেয়ারের গতিপ্রকৃতি তুলে ধরে। ফলে দু’সূচকের পরিবর্তন বলে দিচ্ছে বাজারের অবস্থা মন্দায়। ডিএসইর তথ্যই বলছে, শুধু টাকার অঙ্কে নয়, শেয়ার ও স্টকের লেনদেনের পরিমাণেও বড় পরিবর্তন। গত প্রায় ৯ মাসে শেয়ার ও স্টক লেনদেন কমেছে ২৯ কোটি ২৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৩১টি। লেনদেনের ইউনিট বা পরিমাণ কমার অর্থ বাজারে কেনাবেচার গতিতে পরিবর্তন এসেছে। সিডিবিএলের দেয়া তথ্যে, বাজারের এ চিত্রের সাথে বিও হিসাবের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখলে আরেকটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পরিচালনযোগ্য বিও হিসাব ছিল ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৬টি। আর ১৯ অক্টোবর তা বেড়ে হয়েছে ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৯১৬টি। বৃদ্ধি ২৪ হাজার বা প্রায় ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। কিন্তু শেয়ার রয়েছে এমন বিও হিসাবের সংখ্যা ১২ লাখ ৩৪৪টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ ৪ হাজার ৮৭৪টি। বৃদ্ধি ৪ হাজার ৫৩০টি বা প্রায় শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, পরিচালনযোগ্য হিসাবের বৃদ্ধির হার শেয়ারধারী হিসাবের বৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রায় চার গুণ। এ তুলনা দেখায়, বিও হিসাবের মোট সংখ্যা বাড়লেও শেয়ার ধারণকারী হিসাবের বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ধীর। তবে এ ব্যবধানের অর্থ এ নয় যে নতুন খোলা হিসাবগুলোর সব কটিই বিনিয়োগহীন। পুরনো হিসাবের অবস্থা পরিবর্তন, নতুন হিসাবের শ্রেণিবিন্যাস এবং হিসাব সক্রিয় হওয়ার সময়ের মতো বিষয়ও এতে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিষ্ক্রিয় বিও হিসাবের বৃদ্ধির হার আরো বেশি। ১৭ ফেব্রুয়ারি এ ধরনের বিও হিসাব ছিল ৬৯ হাজার ৭৫৬টি। আর ১৯ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ২৭৯টিতে। বৃদ্ধি ৭ হাজার ৫২৩টি বা ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্য দিকে পরিচালনযোগ্য হিসাব বেড়েছে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ হারে। অর্থাৎ, নিষ্ক্রিয় হিসাব বৃদ্ধির হার পরিচালনযোগ্য হিসাবের বৃদ্ধির হারের সাত গুণেরও বেশি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ব্যালেন্সশূন্য বিও হিসাবও বেড়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬টি। ১৯ অক্টোবর তা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৬৩টি। বৃদ্ধি ১১ হাজার ৯৪৭টি বা প্রায় ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। এই দুই শ্রেণীর হিসাবের বৃদ্ধি বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে নিষ্ক্রিয় ও ব্যালেন্সশূন্য হিসাব এক বিষয় নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। সিডিবিএল তথ্য বলছে, প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যায়ও পতন দেখা যাচ্ছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি এই হিসাব ছিল ৪৩ হাজার ১০১টি। ১৯ অক্টোবর তা কমে হয়েছে ৪১ হাজার ৯৮৬টি। অর্থাৎ, কমেছে ১ হাজার ১১৫টি বা প্রায় ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তবে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গত প্রায় ৯ মাসের পরিসংখ্যানের তুলনামূলক পাঠে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, পরিচালনযোগ্য বিও হিসাব বেড়েছে, কিন্তু শেয়ারধারী হিসাবের বৃদ্ধি তুলনায় অনেক কম। দ্বিতীয়ত, বাজারমূলধন কমেছে ৩৫ হাজার ২৫৪ কোটি ৬৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা এবং ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ১১৯ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট। তৃতীয়ত, নিষ্ক্রিয় বিও হিসাব বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ হারে, আর প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের হিসাব কমেছে। একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- বিও হিসাব বাড়ার সাথে পুঁজিবাজারে সক্রিয় বিনিয়োগ কেন একই তালে বাড়ছে না?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারমূলধন কমা, লেনদেনের অঙ্কে পতনের তথ্য এবং প্রধান সূচকের নি¤œমুখী পরিবর্তন- এ তিনটি দিক একসাথে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বাজারের দুর্বলতার কারণ নির্ধারণ করতে হলে অবশ্যই এ সময়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলোর আয়, লভ্যাংশ, সুদের হার এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে যে ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে বিনিয়োগকারীদের আমানতের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর উপর্যুপরি ব্যথতার কারণেই দেশের পুঁজিবাজারের সঙ্কট কোন ভাবেই কাটছে না বরং দিনের পর দিন তা বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এমতাবস্থায় মার্টেকে স্বস্তি ফেরাতে কর্তৃপক্ষ যুৎসই, সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কোন ভাবেই যাতে মূলধন না করে সেদিকে জোরদার তদারকী দরকার। যা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষিকা ও প্রাবন্ধিক।
