Published on
:
2 min read
সুমন ঘোষ, বেলদা
'আজ মেরে পাস বিল্ডিং হ্যায়, প্রপার্টি হ্যায়, ব্যাঙ্ক ব্যালান্স হ্যায়, বাংলা হ্যায়, গাড়ি হ্যায়। ক্যায়া হ্যায় তুমহারে পাস?' ১৯৭৫–য় 'দিওয়ার'–এ উদ্ধত প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছিলেন বিজয় বর্মা (অমিতাভ বচ্চন)। খুব শান্ত গলায় রবি বর্মার (শশী কপূর) সংযত জবাব ছিল, 'মেরে পাস মা হ্যায়!'
পর্দার সেই বহুচর্চিত ডায়লগ কিঞ্চিৎ বদলে অনুপমা, মাফ করবেন, আদিত্য দত্ত বলতেই পারেন, 'মেরে পাস পাপা হ্যায়।' বলতে পারেন নয়, বলছেনও, 'এটা তো সত্যি কথাই। বাবা না থাকলে এ লড়াই আমি কিছুতেই জিততে পারতাম না।' যা শুনে আদিত্যর মাথায় স্নেহের হাত রেখে বাবা, প্রান্তিক চাষি অনুপ বলছেন, 'সন্তানের সুখই আমার সুখ। সব সময়ে ওর সঙ্গে আছি।'
এই পর্যন্ত পড়ে 'মধুরেণ সমাপয়েৎ' মনে হলে কিন্তু ভুল হবে। অনুপমা থেকে আদিত্য হয়ে ওঠা লড়াইয়ের পরতে পরতে রয়েছে বাধা ডিঙোনোর গল্প। গ্রামের নাম অমর্ষিয়া। ঠিকানা— ঠাকুরচক, থানা: বেলদা, জেলা: পশ্চিম মেদিনীপুর। এমন প্রত্যন্ত গ্রামের আটপৌরে এক মেয়ের যুবক হয়ে ওঠা যে মোটেই সহজ ছিল না তা বলাই বাহুল্য।
অনুপের দুই সন্তান। বড় মেয়ে অনুপমা উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বেলদার একটি শপিং মলে কাজ শুরু করেন। ছেলে কর্মসূত্রে উত্তরাখণ্ডে। মলে কাজ করার সময়ে এক মেয়েকে মনে ধরে অনুপমার। ঘনিষ্ঠতাও হয়। অনুপমা বিয়ে করে সংসার পাতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু সে মেয়ে যখন বুঝতে পারেন যে, অনুপমার ভালোবাসা ঠিক আর পাঁচ জন মেয়ের মতো নয়, তিনি সরে যান।
অনুপমার কথায়, 'ওই বিচ্ছেদ আমাকে বড্ড বিচলিত করে। মনে হয়, আমি তো মনে–প্রাণে পুরুষ। তা হলে বাইরে এই নারী চেহারা নিয়ে ঘুরছি কেন? তারপরেই সিদ্ধান্ত নিই, মনের ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে হলে আমাকে পুরুষই হতে হবে।' বাবাকে তিনি বিষয়টি জানান ২০২৪–এ।
অনুপ সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেন প্রায় এক বছর। প্রথম চিন্তা, অর্থ। দ্বিতীয় ভয়, গ্রামের লোকজন কী বলবেন! সম্পদ বলতে সাকুল্যে দুই বিঘে জমি। সংসারে টনটনে অভাব। পরে নিজেই মুশকিল আসান করে ফেলেন অনুপ।বলছেন, 'ভাবলাম, মেয়ের বিয়ে দিতে হলেও তো টাকা খরচ হতো। সেই টাকা দিয়েই মেয়ের ইচ্ছেপূরণ করলে কেমন হয়!' ২০২৫ থেকে মেয়ের চিকিৎসা শুরু হয় কলকাতায়। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে।
প্রথম দিকে আড়ালে-আবডালে গ্রামের কিছু লোকজন দু'–চার কথা বললেও সামনে কিছু বলার সাহস পাননি কেউ। কারণ, প্রথম থেকেই এ লড়াইয়ে মেয়ের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন অনুপ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'অনুপমার প্রেম'–এ 'একাদশবর্ষ বয়ঃক্রমের মধ্যে অনুপমা নবেল পড়িয়া পড়িয়া মাথাটা একেবারে বিগড়াইয়া' ফেলেছিল। শেষে সেই অনুপমাই জানতে চেয়েছিল, 'কেন আমাকে বাঁচালে?'
তবে, বাস্তবের অনুপমা (পড়ুন, আদিত্য) পা রাখেন মাটিতেই। তাঁর সেই প্রথম প্রেম এখন অন্য কারও ঘরনি। আদিত্যর কথায়, 'তাতে কী? অন্য কাউকে ভালোবেসে নতুন করে সংসার পাতব।' এ ভাবেই তিনি এগিয়ে চলতে চান। কোনও উপমা ছাড়াই জ্বলে উঠতে চান সূর্যের মতো। সেই কারণেই কি অনুপমা থেকে অনুপম না হয়ে আদিত্য?