প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার
স্টাফ রিপোর্টার
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে দলটি।
গতকাল রোববার বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল। দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বৈঠকে অংশ নেয়। পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, জামায়াতের একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল গত ২৪ অক্টোবর ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে সুনির্দিষ্ট নয়টি অভিযোগ লিখিতভাবে পেশ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগের সমর্থনে বিভিন্ন ছবি, আহত ব্যক্তিদের ছবি এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের আলোকচিত্রও কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে মোড়ে মোড়ে রঙিন প্রতীকসংবলিত পোস্টার ব্যবহার করে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, হিন্দু ও সরকারি চাকরিজীবী ভোটারদের হুমকি দিয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি এবং দুপুর ২টার আগে মাইক ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো। এ ছাড়া সরকারি চিকিৎসকদের ব্যবহার করে ইউনিয়নে ইউনিয়নে মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে ভোটারদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং মসজিদে সোফা সেট স্থাপন করে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগও করেছে দলটি।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করা এবং ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ্যে ওই প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও কমিশনে তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে প্রার্থীর বাসায় রাতে বৈঠক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণামূলক কর্মকা-ের অভিযোগের তদন্ত করে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
নির্বাচনী এলাকায় কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ২২ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার আদর্শ স্কুলের সামনে ওই স্কুলের শিক্ষক আক্কাস আলী চার নারী জামায়াত কর্মীকে ভোটের গণসংযোগের সময় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হেনস্তা করেন। জামায়াতের প্রার্থী সম্পর্কেও তিনি কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২৪ অক্টোবর পৌরসভার হাজীপাড়ায় আমানতুল্লাহ ইসলামী একাডেমির পাশে মহিলা জামায়াত কর্মী সায়মা আক্তারের বাড়িতে গিয়ে বিএনপি নেতা ফরহাদ হোসেন তাঁকে নির্বাচনী কাজে বের না হওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই দিন ভূল্লী উপজেলার বড়গাঁও ইউনিয়নে জামায়াতের ইউনিয়ন সেক্রেটারি মাসুদ রানার দোকানের সামনে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুলতান, বাবুল ও একজন ভ্যানচালকের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাদ্দাম, ইউনিয়ন সেক্রেটারি মাহফুজ, তাঁতীদলের জেলা সভাপতি আনোয়ার হোসেন (বাবুল মাস্টার), ইউনিয়ন সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন ও ইউনিয়ন ছাত্রদলের নাঈমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আহতরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বেংরোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কুতপার হাট কেন্দ্রের পাশে জামায়াত কর্মীদের নির্বাচনী কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিএনপি কর্মী মাজেদুর রহমান, যুবদল সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন, যুবদল নেতা আব্দুল হামিদ (সাবেক মেম্বার) ও সাজুর নাম উল্লেখ করা হয়। রুহিয়া উপজেলার আখানগর ইউনিয়নের চতুরাখোর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় জামায়াতের অসংখ্য ব্যানার কেটে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ঘটনায় জনি পারভেজ মেম্বার (প্যানেল চেয়ারম্যান) জড়িত বলে অভিযোগ করেছে দলটি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনী এলাকায় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু হিন্দু ভোটার ও সরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এতে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং তাঁরা নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করলেই নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হয় না; দায়িত্ব পালনকারীদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক চাপের মুখে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। এ কারণে ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হয়েছে।
১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো নির্বাচন বিতর্কিত হলে তার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন যেন কোনোভাবেই মাগুরা উপনির্বাচনের মতো বিতর্কিত পরিস্থিতির দিকে না যায়, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, কমিশনের কাছে অভিযোগগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন তাঁদের বক্তব্য শুনেছে এবং বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। তবে তাঁরা পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি।
জামায়াত এখনো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় নি জানিয়ে তিনি বলেন, দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং তাদের প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
জামায়াতের তিনটি দাবি তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে কমিশনের হাতে থাকা ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সদস্য শরিফুল আলম জিন্নাহ এবং সাবেক সিনিয়র সচিব খ. ম. কবিরুল ইসলাম প্রমুখ।
