ঢাকা: শরতের বিদায় আর হেমন্তের আগমনের এই সন্ধিক্ষণে ধূলিকণা ও ধোঁয়াশার চাদরে ঢেকে যেতে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার-এর তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ঢাকার বায়ুর মান সূচক ১৪৯-এ পৌঁছেছে, যা ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। বৈশ্বিক বায়ুদূষণের তালিকায় আজ ঢাকার অবস্থান ১২তম। শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এই বাতাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বায়ুদূষণ শুধু ঢাকার একক সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুমণ্ডলের এক নীরব সংকটের অংশ। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক পরিমাপে বায়ুর মান সূচকে পাকিস্তানের লাহোর ২৩৮ স্কোর নিয়ে তালিকার শীর্ষে এবং ভারতের নয়া দিল্লি ২১৪ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এছাড়া ভিয়েতনামের হানোই, ইরাকের বাগদাদ এবং পাকিস্তানের করাচি যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইকিউএয়ার মানদণ্ড অনুযায়ী বায়ুর মান শূন্য থেকে ৫০ ভালো, ৫১ থেকে ১০০ মাঝারি, এবং ১০১ থেকে ১৫০ সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়। সূচক ১৫১ ছাড়িয়ে গেলে তা সাধারণ মানুষের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
ঢাকার বায়ুর মান এভাবে ক্রমাগত অবনতি হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। শুষ্ক মৌসুম শুরুর সাথে সাথে শহরের চারপাশের ইটভাটাগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা প্রচুর পরিমাণে ছাই ও কার্বন নির্গমন করে। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ, উন্মুক্ত স্থানে নির্মাণসামগ্রী রাখা এবং নগরজুড়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ অনাকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বেড়ে যায়। এছাড়া ফিটনেসবিহীন ও পুরোনো যানবাহন থেকে নিঃসৃত কালো ধোঁয়া বাতাসের বিষাক্ত উপাদান বাড়িয়ে তুলছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এই দূষিত কণাগুলো বাতাসে দীর্ঘসময় ভেসে থাকে।
বায়ুর মান সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের ওপর। অ্যাজমা, অ্যালার্জি, ব্রংকাইটিস এবং হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীদের কষ্ট এ সময় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বাতাসে ভেসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা সহজে শ্বাসনালি দিয়ে ফুসফুসে প্রবেশ করে স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে সুস্থ মানুষেরও শ্বাসকষ্ট, সার্বিক ক্লান্তি ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
এই বায়ুদূষণের হাত থেকে নিজেদের এবং স্বজনদের রক্ষা করতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু জরুরি সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই মানসম্মত মাস্ক পরিধান করা উচিত, যা ধূলিকণা থেকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেয়।
সংবেদনশীল ব্যক্তি ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের যথাসম্ভব সকালে বা বেশি ধুলাবালিযুক্ত স্থানে দীর্ঘসময় অবস্থান এড়িয়ে চলা ভালো। বাসাবাড়িতে ধুলোবালি প্রবেশের পথ বন্ধ রাখা এবং ঘরবাড়ি নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে মোছা জরুরি। শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণ রোধে সরকারি পর্যায়ে নির্মাণকাজ ঢেকে রাখা, রাস্তাঘাটে পানি ছেটানো এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
