অভিনয়জগৎ, তারকাদের জৌলুস বাইরে থেকে অত্যন্ত চটকদার মনে হলেও, জীবনে ওঠাতপড়া, ভাল-মন্দের ধাক্কা সামলাতে হয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও। অভিজ্ঞতাই তাঁদের জীবনের পাঠ দেয়। আবার কখনও কখনও জীবনের টালমাটাল পরিস্থিতি সামলাতে না পারলে, তারকা সন্তানেরাও অভিভাবকদের কাছে পরামর্শ চান।
এমনই এক সময়ে বাবার কাছ থেকে গভীর জীবনবোধের শিক্ষা পেয়েছিলেন অভিনেত্রী শ্রুতি হাসন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ৪০ বছরের অভিনেত্রী সম্প্রতি একটি ঘটনায় বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। সমস্যার কথা জানাতে, অভিনেতা বাবা কমল হাসন তাঁকে পরামর্শ দেন, অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজের দিকে তাকানো জরুরি। তিনি বলেন, "তুমি আজ অনেকটাই পরিণত। এই বয়সে এসেও কি তুমি এ ভাবে ভেঙে পড়বে? উত্তরটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে।" বাইরের মানুষের কাজের সমালোচনা নয়, বরং মেয়েকে আত্মসমীক্ষা বা আত্মমূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
সম্পর্কের টানাপড়েন বা জীবনে আঘাত এলে সাধারণত আঙুল ওঠে অন্যের দিকে— কে, কী ভুল করল, পরিস্থিতি কতটা প্রতিকূল ছিল ইত্যদি বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই চেনা বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে মেয়েকে আত্মানুসন্ধানের পাঠ দিয়েছেন অভিনেতা।
বেঙ্গালুরু নিবাসী মনোবিদ ডেলনা রাজেশ বলছেন, ‘‘আমরা যখন সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যাই, অন্যে কী আচরণ করল, সেটাই ভাবতে থাকি। নিজেদের পরিস্থিতির শিকার হিসেবে ভাবতে থাকি।’’ তিনি বলছেন, অন্যের আচরণের দিকে না তাকিয়ে, তার বদলে মনে কি চলছে, কেনই বা চলছে, সেটা চলা উচিত কি না, সে দিকেই নজর দেওয়া দরকার।
ধরা যাক, সঙ্গী কাজের ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে পারলেন না। আপনি রেগে গিয়ে ভাবলেন, তিনি অবহেলা করছেন বা, তাঁর কাছে আর আপনার দাম নেই। কিন্তু মনোবিদের কথায়, ভেবে দেখা দরকার, ফোন না ধরায় এত রাগ বা উদ্বেগের কারণ কী? কোনও ভয় বা পুরোনো ক্ষত কি, এই ঘটনায় জেগে উঠেছে? ব্যক্তিবিশেষ কী ভাবে আচরণ করবেন তা তাঁর একান্ত নিজস্ব বিষয়। কিন্তু একজন ফোন ধরছেন না বলে, অন্যের ভিতরে যে ভয় বা উৎকণ্ঠা কিংবা হতাশা কাজ করে, সেটি তাঁর মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা।
ডেলনা বলেন, ‘‘পরিণতমনস্কতা হল, নিজেদের প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর দেওয়া। কোন পরিস্থিতিতে কোন আচরণ সমীচীন, তা বুঝতে শেখা।’’
মানসিক টানাপড়েনে হতাশ লাগলে কী কী করা প্রয়োজন
মনের দিকে তাকানো জরুরি: সম্পর্কে বা জীবনে টানাপড়েন তৈরি হলে, সাধারণত অন্য মানুষটি কী অন্যায় করলেন, তা খুঁজতেই সময় এবং শক্তি খরচ হয়ে যায়। তাঁদের সেই আচরণ মনের ভিতরে ঠিক কোন ক্ষত তৈরি করছে বা সুপ্ত অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে, তা বেশির ভাগ মানুষই খতিয়ে দেখেন না। সম্পর্কে বদল হলেও, একই পরিস্থিতি অন্য মানুষের সঙ্গে ঘটতে পারে। ফলে, মানসিক সংঘাত কোনও না কোনও কারণে চলতেই থাকে। মনের অবচেতনে ভয়, প্রত্যাশা একই থেকে যায়।
মনোবিদ মনে করাচ্ছেন, আঘাত পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, দোষ নিজেরই। আত্মসমীক্ষা মানে নিজেকে দোষারোপ করা নয়। জীবনের প্রতিটি আঘাত বা খারাপ অভিজ্ঞতার জন্য নিজেকে দায়ী করাও ঠিক নয়। পরিণত মানসিকতার অর্থ এই নয় যে, দুঃখ, রাগ বা হতাশা আসবে না। বরং পরিণতমনস্কতা শেখায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ কী ভাবে করা যায়। দৃঢ় হয়েও কী ভাবে শান্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দর্শানো যায়।
