জুলাই-আগস্টের গণহত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, ডা. দীপু মনিসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে চলতি সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হবে। একই সময়ে মিরপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। দীর্ঘ এক মাস বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাত নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে প্রসিকিউশনে জমা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুত করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে বলে আশা করছেন তারা।
এই সাত নেতা হলেন আমির হোসেন আমু, ডা. দীপু মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, ফারুক খান, মির্জা আজম ও শাহজাহান খান।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বৈঠকে অংশগ্রহণ, কারফিউ জারি এবং কারফিউয়ের আড়ালে গণহত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর বিস্তারিত জানানো হবে।
মিরপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটির আনুষ্ঠানিক অভিযোগও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহেই এ মামলায় অভিযোগ দাখিল করা হবে। এ মামলায় কামাল আহমেদ মজুমদার ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী মোল্লাসহ অন্যরা আসামি।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা পড়েছে। এসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কয়েকটি মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
ফেসবুকে পোস্ট, নিঃশর্ত ক্ষমা দুই আইনজীবীর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর তারা ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নজরে আনার পর দুই আইনজীবীকে তলব করা হয়। সোমবার তারা ট্রাইব্যুনাল-২-এ হাজির হন। তাদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী
আদালতকে জানান, সংশ্লিষ্ট পোস্টটি মুছে ফেলা হয়েছে। এ ধরনের পোস্ট দেওয়া ভুল হয়েছে বলে তাঁরা স্বীকার করেছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
দুই আইনজীবী নিজেরাও ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। বিষয়টি লিখিতভাবে জানানোর জন্য তারা সময় আবেদন করেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত অবমাননার কার্যক্রমের শুনানি আগামী ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আইনজীবীদের কাছ থেকে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রত্যাশিত। আদালত সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে সংশ্লিষ্ট দুই আইনজীবী নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছেন এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। তাদের লিখিত বক্তব্য পাওয়ার পর বিষয়টি নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব সরকারের
ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা প্রসিকিউশনের দায়িত্ব নয়। ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব বিচার পরিচালনা করা এবং দণ্ডিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকরের পরোয়ানা জারি করা। এসব পরোয়ানা কার্যকরের দায়িত্ব সরকারের।
তিনি বলেন, দণ্ডিত কোনো আসামি বাংলাদেশে অবস্থান করলে তাকে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের বাইরে থাকা আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আগে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশসহ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকরের পরোয়ানাও বহাল রয়েছে।
রায়ের অপেক্ষায় দুটি মামলা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কয়েকটি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। এর মধ্যে দুটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। আরেকটি মামলার যুক্তিতর্ক প্রায় শেষ পর্যায়ে। আরও কয়েকটি মামলার বিচার কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে দ্রুত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল এবং যেসব মামলায় অভিযোগ দাখিল হয়েছে, সেগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করার বিষয়ে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তারা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
