কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে তরুণীকে ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বার অভিযোগ উঠছে জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর প্রসব ব্যথা উঠলে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে চৌদ্দগ্রাম বাজার এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।
তবে সন্তান জন্মের পরপরই নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। নবজাতকের প্রসব সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয়ভার অভিযুক্ত যুবকের পরিবারের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হলেও ভুক্তভোগী পরিবার আদৌ সেই অর্থ পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অভিযুক্ত যুবক জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের কালকোট গ্রামের আমির হোসেন প্রকাশ লাকির ছেলে। অভিযোগে একই গ্রামের শালিসদার হাজী মোস্তফা এবং অভিযুক্তের জেঠা নজরুল ইসলাম মনিরের নামও উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগ, তার বৃদ্ধ অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় ঢাকার হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়েছিল তাকে। এ সময় বাড়িতে থাকা তার মেয়েকে জাহিদুল ইসলাম ওরফে আবির জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। ভয়ে মেয়েটি প্রথমদিকে কাউকে বিষয়টি জানায়নি।
পরবর্তী সময়ে মেয়েটির শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ও বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিলে তার মা বিষয়টি বুঝতে পারেন। পরে মেয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত ঘটনা জানার পর অভিযুক্তের পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করেন তিনি। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম দিকে অভিযুক্তের পরিবার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং উল্টো ভুক্তভোগীকে নিয়ে নানা অপবাদ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে অভিযুক্ত যুবক ঘটনাটি স্বীকার করলে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রস্তাব দিলে অভিযুক্তের পরিবার তা নাকচ করে দেয় এবং বিষয়টি আইনগত ভাবে নিষ্পত্তির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দ্বারা মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্তের বাবা প্রবাসে থাকায় তার জেঠা নজরুল ইসলাম মনির শুরু থেকেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এজন্য একই গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি হাজী মোস্তফাকে দিয়ে ভুক্তভোগীর মাকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ভুক্তভোগীর মাকে একাধিকবার হাজী মোস্তফার বাড়িতে ডেকে নিয়ে সমাধানের জন্য চাপ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
ভুক্তভোগীর বাবা প্রায় ১২ বছর আগে মারা যান। এরপর থেকে মা ও চার ভাই-বোন নিয়ে পরিবারটি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। পরিবারের পুরুষ অভিভাবক না থাকায় তারা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীদের চাপের মুখে পড়েছেন বলে দাবি স্বজনদের।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সামাজিক স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিজেদের অসহায় অবস্থার কারণে তারা চরম সংকটে পড়েছেন। তবে নবজাতককে কার কাছে দেওয়া হয়েছে, বর্তমানে শিশুটি কোথায় রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
ভুক্তভোগীর বোন বলেন, ‘আমার বাবা ১২ বছর আগে মারা গেছেন। এরপর থেকে মা আমাদের চার ভাই-বোনকে নিয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন। আমার মা নানুর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় থাকার সময় আমার বোনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জানতে পারি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আমাদের বোনকে নানা অপবাদ দেওয়া হয়। পরে আমাদের ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে আমার বোন একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পারিবারিক অবস্থা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার হিসেবে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা পাব কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শালিসদার হাজী মোস্তফা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি অভিযুক্তের জেঠা মনিরের দোকানে বসা ছিলাম। অন্যরা বাড়ির ভিতরে গিয়ে সমঝোতা করেছে বলে জেনেছি। টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করলেও তবে কত লাখ টাকা দিয়ে সমঝোতা হয়েছে তা স্পষ্ট করেননি। নবজাতক বাচ্চা বিক্রি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’
অভিযুক্তের জেঠা নজরুল ইসলাম মনির বলেন, ‘এই বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। কারা কীভাবে কী করেছে জানা নেই।’
চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোছাইন বলেন, ‘বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দায়ের করলে আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
