বাড়িঘর ও বাজারের ফেলে দেওয়া বর্জ্য থেকেই তৈরি হবে জৈব সার ও মাছের খাবার। থাকবে বায়োগ্যাস উৎপাদনের উদ্যোগও। একদিকে কমবে পরিবেশদূষণ, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার টিপনা গ্রামে নির্মিত হচ্ছে আধুনিক কমিউনিটিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট। প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মডেল গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্ল্যান্টটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সারা দেশে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১৫টি গ্রামের মধ্যে রয়েছে ডুমুরিয়ার টিপনা। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার এবং গ্রামীণ পর্যায়ে টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্ল্যান্টের আওতায় বাড়িঘর ও বাজার থেকে পচনশীল এবং অপচনশীল বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ করা হবে। পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হবে জৈব সার। এ ছাড়া লার্ভা উৎপাদনের মাধ্যমে মাছের খাবার তৈরির ব্যবস্থা থাকবে। প্লাস্টিকসহ অপচনশীল বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি বায়োগ্যাস উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হবে। ফলে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমার পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য খাতে বিকল্প উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনুসরণ করা হবে বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের থ্রি-আর (3R) নীতি। এ পদ্ধতিতে বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধার করে উৎপাদনমুখী কাজে লাগানো হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি ডুমুরিয়া উপজেলা কমপ্লেক্সের সম্মেলনকক্ষে এ প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহার ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উৎপাদিত জৈব সার কৃষিকাজে এবং মাছের খাবার মৎস্য উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন খরচ কমানোরও সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে প্রকল্পটি।
উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ দারুল হুদা বলেন, “আধুনিক এ প্ল্যান্টের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, পরিবেশদূষণ রোধ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে এলাকার প্রায় ২৫ হাজার মানুষ উপকৃত হবেন।”
২৪০ পরিবারে আধুনিক টয়লেট, ৫০টি ডিপ টিউবওয়েল
শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, টিপনা আদর্শ গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থায়ও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে গ্রামের ২৪০টি পরিবারে আধুনিক টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হয়েছে ৫০টি ডিপ টিউবওয়েল। এসব উদ্যোগের ফলে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “টিপনা আদর্শ গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৪০টি পরিবারে আধুনিক টয়লেট এবং গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৫০টি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামবাসীর স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও নিরাপদ পানির সুবিধা বাড়বে।”
খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি বলেন, “আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট নির্মাণ সরকারের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে জৈব সার ও মাছের খাবার উৎপাদনের পাশাপাশি বায়োগ্যাস তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিবেশদূষণ কমার পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।”
