বর্ষা শেষে হেমন্তের আগমনে গ্রামবাংলায় নবান্নের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু তিস্তাপাড়ের কৃষকদের জীবনে সেই আনন্দের বদলে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একের পর এক বসতভিটা, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারানোর আশঙ্কায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে স্বপ্নের আমন ধান কেটে গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা চল্লিশসাল এলাকায় গত এক সপ্তাহে ২৭টি পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে নদীগর্ভে চলে গেছে উঠতি আমন ধানসহ অন্তত ৫০ একর ফসলি জমি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, নদীর পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। তবে এ সময়ে ভাঙনরোধের কাজের জন্য বরাদ্দ না থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারালেও স্থায়ী প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
ভাঙনের মুখে বসতভিটা, চোখের সামনে হারাচ্ছে ফসল, বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। ভাঙনের আশঙ্কায় কেউ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে বসতভিটা রক্ষার চেষ্টা করছেন। কোথাও ইতোমধ্যে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, আবার কোথাও ঘরবাড়ি রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। একই সঙ্গে নদীর গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ফসলি জমি।
ভুক্তভোগীরা জানান, সম্প্রতি তিস্তার পানি বাড়ার পর স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। পরে পানি কমতে শুরু করলে নদীর স্রোতের গতিপথ জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরের দিকে পরিবর্তিত হয়। এতে ওই এলাকায় ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করে।
গত এক সপ্তাহে ওই চরের ২৭টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন বাবর আলী, গোলাপী বানু, গোলজার হোসেন, নুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আহাদ আলী, জহুরা বেগম, আসাদুল ইসলাম, আব্দুল হক, মইনুল ইসলাম, শাহ আলম, নজু মিয়া, মোন্নাফ আলী, আবুল হোসেন, শফিকুল ইসলাম, দুলু মিয়া, নুরল ইসলাম, নাজমুল হক, ঝন্টু, বেলাল ও ওমরসহ অনেকে। ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে তাঁদের অনেকে ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দিন কাটছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।
‘হঠাৎ স্রোতের গতিপথ বদলে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে’, ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা জাহেদুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরে জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরে বসবাস করে চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন তাঁরা। এবারের মূল বন্যায় তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু হঠাৎ তিস্তার স্রোতের গতিপথ চরের দিকে পরিবর্তিত হওয়ায় ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, কয়েক দিন ধরে চল্লিশসাল এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবারের ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তাঁরা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, তিস্তার ভাঙনে বেশ কিছু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের সহায়তা দেওয়া হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। বরাদ্দ না থাকায় ভাঙনরোধে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ অনিশ্চিত, রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, বন্যার পর হঠাৎ ওই এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইখুল আরেফিন বলেন, তিস্তার দুই তীরে ভাঙন তীব্র হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কাঁচা আমন ধানের গাছ কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। এখন পর্যন্ত সাড়ে ১৭ বিঘা জমির আমন ধান কাঁচা অবস্থায় কেটে ফেলেছেন কৃষকেরা।
যে ধান ঘরে তুলে পরিবারের সারা বছরের খাবারের জোগান দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষকেরা, সেই ধানই এখন গবাদিপশুর খাবারে পরিণত হচ্ছে। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে তিস্তাপাড়ের মানুষ এখন দিশেহারা। তাঁদের দাবি, দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও কৃষকদের ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় নদীভাঙনে নিঃস্ব পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
The post তিস্তায় ভাঙনের তাণ্ডব, স্বপ্নের আমন ধান গরুর খাবার—বাঁচার আকুতি কৃষকের appeared first on ভোরের চেতনা.
