কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়লেও খেলাপি ঋণ ও বকেয়া আদায় নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। গত অর্থবছরের শেষে কৃষিঋণের খেলাপি ও বকেয়া কিছুটা কমেছিল। কিন্তু নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই পরিস্থিতি আবার পাল্টেছে। এই দুই মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৩৯ কোটি টাকা। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। বিপরীতে বিশেষায়িত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কিছুটা কমেছে খেলাপি ঋণ। সবমিলে গত আগস্ট শেষে কৃষিতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের এক প্রতিবেদন এমন চিত্র উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে শুধু ঋণ আদায়ে দুর্বলতা নয়, ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর হওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ও কৃষিপণ্যের দামের উঠানামারও প্রভাব রয়েছে। ২০২৫ সালে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা কঠোর করার ফলে নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ না করা ঋণ দ্রুত বকেয়া ও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে। অন্যদিকে সার, জ্বালানি ও সেচের খরচ বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে;
বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়া এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষকের আয়ও প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না। ফলে সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও তদারকির ঘাটতি এবং কৃষিকাজের বাইরে ঋণের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে ঋণ বিতরণ ও আদায় বাড়লেও খেলাপি ঋণের চাপ কমছে না।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ কমে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বকেয়া ঋণ কমে ১৯ হাজার ৮০৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় নেমে আসে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ঋণ পরিস্থিতির সেই উন্নতি ধরে রাখা যায়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আগস্ট শেষে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ১৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ফলে দুই মাসে এ খাতে খেলাপি বেড়েছে ৪৩৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। একই সময়ে বকেয়া ঋণ বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। জুনের তুলনায় বকেয়া বেড়েছে ২ হাজার ১৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঋণ আদায়ের পরিমাণ বাড়লেও কৃষিঋণের একটি বড় অংশ সময়মতো আদায় হচ্ছে না।
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে উদ্বেগ বেশি : কৃষিঋণের খেলাপি ও বকেয়া বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে আগের অর্থবছরের তুলনায় এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ১৪৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে বকেয়া বেড়েছিল ৭৩ দশমিক ১১ শতাংশ। নতুন অর্থবছরের আগস্টেও এ খাতে ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত আগস্ট শেষে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮৭৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আগের বছরের একই মাস পর্যন্ত এ অঙ্ক ছিল ৪৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বা ৪২০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে খেলাপি সামান্য কমেছে। গত জুনে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। একইভাবে এসব ব্যাংকের বকেয়া কৃষিঋণও দ্রুত বেড়েছে। আগস্ট শেষে বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৮৩৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই মাস পর্যন্ত ছিল ৩৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বকেয়া বেড়েছে ১১৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বা ৪৫০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বকেয়া ঋণ বেড়েছে ১৩৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ফলে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে কৃষিঋণের খেলাপি ও বকেয়াÑ দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ : রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও কৃষিঋণের খেলাপি পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে আগের অর্থবছরের তুলনায় এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আগস্ট শেষে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। গত বছরের আগস্টে এ অঙ্ক ছিল ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ। বকেয়া ঋণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বকেয়া আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু আগস্ট শেষে তা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৪৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ অর্থবছরের শেষে বকেয়া কমলেও নতুন অর্থবছরের শুরুতে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে।
বিশেষায়িত ও বেসরকারি ব্যাংকে কমেছে : রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের বিপরীতে বিশেষায়িত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কৃষিঋণের খেলাপি ও বকেয়ার চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ ও বকেয়া ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছিল। চলতি বছরের আগস্টেও এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল। আগস্ট শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে ১২ হাজার ১৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বকেয়া কমেছে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ সময়ে বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৯২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও খেলাপি ঋণ ও বকেয়া কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ বাড়লেও চলদি অর্থবছরের আগস্টে তা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ৮০১ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বকেয়া কমেছে ২৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা আগস্ট শেষে ৭৪১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
ঋণ বিতরণের সঙ্গে আদায়েও নজর জরুরি : কৃষি ও পল্লী অর্থনীতিতে অর্থের জোগান বাড়াতে ঋণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে ব্যাংকগুলো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ হয়েছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। একই সময়ে ঋণ আদায় হয়েছে ৪৫ হাজার ৬২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। তবে অর্থবছর শেষে আদায়ের জন্য নির্ধারিত ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া ছিল ১৯ হাজার ৮০৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ও শ্রেণিকৃত ঋণ ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ঋণ বিতরণ ও আদায়Ñ দুটিই বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৫৮টি অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ৬ হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ঋণ আদায় বেড়েছে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের বিতরণসহ আগস্টে মোট কৃষিঋণ বিতরণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তবে ঋণ বিতরণ ও আদায় বাড়লেও খেলাপি ঋণ এবং বকেয়ার বড় অঙ্ক থেকে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে কৃষি খাতে কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং খেলাপি ঋণের ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
