স্যুট-কোট পরা কোনো অভিজাত ভদ্রলোক কিংবা শীতের দিনে গায়ে ওভারকোট চাপিয়ে ঘুরে বেড়ানো কোনো সিনেমার নায়ক অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইনদের দিকে তাকালে ঠিক এমনই এক নিখুঁত ও মার্জিত ছবি ভেসে ওঠে। সাদা-কালোর সেই পরিপাটি পোশাক, অদ্ভুত এক চালচলন আর বিনীত ভঙ্গি দেখে মনে হয়, এরা বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে গোছানো ও ভদ্র জাতি!
কিন্তু বরফের রাজ্যের এই শান্তশিষ্ট পাখিগুলোকে আপনি যদি মনে করেন খুব সাদামাটা কোনো জীব, তবে বিশাল এক ভুল করবেন। এদের ভালোবাসার গল্প, সঙ্গিনী খোঁজার কৌশল আর দাম্পত্য জীবনের রীতিনীতি শুনলে মনে হবে কোনো রোমান্টিক হাসির সিনেমা চলছে, যেখানে প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে টানটান উত্তেজনা, নানা ধরনের কৌশল আর রীতিমতো চুরির মহোৎসব!
চলুন, আজ অ্যান্টার্কটিকার হাড় কাঁপানো বরফের দেশে একটু ঘুরে আসা যাক। চোখ রাখা যাক আডেলিস প্রজাতির পেঙ্গুইনদের সেই অ™ু¢ত ও চাঞ্চল্যকর দুনিয়ায়, যেখানে ভালোবাসা প্রকাশ করার প্রধান উপহার হলো এক টুকরো সাধারণ নুড়িপাথর।
শুরু করা যাক একটা সাধারণ সমস্যা দিয়ে। অ্যান্টার্কটিকা মানেই তো চারদিকে শুধুই বরফ আর বরফ। গাছের পাতা, ডালপালা কিংবা ইট-পাথরের কোনো বালাই নেই। অথচ একটি পুরুষ পেঙ্গুইনকে যখন তার মনের মানুষকে নিয়ে ঘর বাঁধতে হয়, তখন তার দরকার পড়ে আস্ত একটা বাসার। বরফের ওপর সরাসরি ডিম পাড়লে তো ঠাণ্ডা আর গলে যাওয়া পানিতে নিমিষেই সব ভেস্তে যাবে!
তাহলে উপায়? সমাধান হলো ছোট ছোট নুড়িপাথর। অ্যান্টার্কটিকার এই বরফ মরুভূমির ভেতর সেই নুড়িপাথরগুলোই হলো সবচেয়ে দামি রত্ন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ! যার কাছে যত বেশি এবং যত সুন্দর গোল গোল নুড়িপাথর আছে, সে তত বড় ধনী। আর এখান থেকেই শুরু হয় প্রেমকাহিনির আসল উত্তেজনা।
বংশবৃদ্ধির ঋতু শুরু হলে পুরুষ পেঙ্গুইনগুলো এক পারফেক্ট সঙ্গীর খোঁজে নেমে পড়ে। মনের মতো কোনো রমণীকে পছন্দ হওয়ার পর তাকে আকর্ষণ করার একটাই মোক্ষম উপায় সবচেয়ে চকচকে, সবচেয়ে মসৃণ একটা নুড়িপাথর উপহার দেওয়া!
ভাবছেন তো ব্যাপারটা কত সহজ? কিন্তু বিশ্বাস করুন, এর চেয়ে কঠিন আর কোনো কাজ হতে পারে না। পুরুষ পেঙ্গুইনটি বরফের ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে, তীব্র হিমশীতল বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে এমন একটা পাথর খুঁজে আনে, যা অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদা। এরপর সে তার হবু স্ত্রীর সামনে গিয়ে অত্যন্ত বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে, ঘাড় বাঁকিয়ে সেই পাথরটি তার পায়ের কাছে খুব যত্নে নামিয়ে রাখে।
দৃশ্যটি দেখলে আপনার মনে হবে কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের পাতা বুঝি বাস্তবে নেমে এসেছে! স্ত্রী পেঙ্গুইনটি যদি উপহারটি দেখে সম্মতি জানায়, তবেই তাদের প্রেম আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় যৌথভাবে বাসা গোছানোর কাজ।
গল্পটা শুনতে বেশ মিষ্টি শোনালেও এর একটা অন্ধকার ও মজার দিকও আছে। আগেই বলেছি, বরফের রাজ্যে নুড়িপাথরের মারাত্মক অভাব। আর সেই সুযোগেই শুরু হয় পেঙ্গুইন সমাজের অপরাধ জগতের কালোবাজার!
সব পুরুষ পেঙ্গুইন তো আর অত কষ্ট করে মাইল দূর থেকে পাথর কুড়িয়ে আনতে চায় না। কিছু অলস ও চালাক স্বভাবের পেঙ্গুইন থাকে, যারা সহজ পথ খুঁজতে ওস্তাদ। এরা কী করে জানেন? অন্য কোনো সরল ও পরিশ্রমী পেঙ্গুইন যখন তার সঙ্গিনীকে আকর্ষণ করার জন্য পাথর কুড়িয়ে এনে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখে, তখন এই ফন্দিবাজ পেঙ্গুইনগুলো সুযোগ বুঝে চোখ এড়িয়ে একটা করে পাথর সুকৌশলে চুরি করে নিজের বাসায় নিয়ে চলে যায়!
ব্যাপারটা অনেকটা এমন আপনি জীবনে অনেক কষ্ট করে একটা গাড়ি কিনেছেন, আর আপনার চতুর প্রতিবেশী সুযোগ বুঝে আপনার গ্যারেজ থেকেই সেটা গায়েব করে দিয়েছে!
আর যখনই এই পাথর চুরি হাতেনাতে ধরা পড়ে, তখনই শুরু হয় পেঙ্গুইনদের আসর জমে ওঠার অংশ। দুই পুরুষ পেঙ্গুইনের মধ্যে শুরু হয়ে যায় তুমুল মারামারি! কেউ কাউকে ছাড় দেয় না ঠোঁটে ঠোঁটে যুদ্ধ, একে অপরকে ধাক্কা দেওয়া, বরফের ওপর গড়াগড়ি খাওয়া সব মিলিয়ে পুরো কাণ্ডকারখানা! আশপাশের বাকি পেঙ্গুইনগুলো তখন জটলা পাকিয়ে সেই মারামারি এমন মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করে, যেন মনে হয় তারা কোনো বিনা খরচে চলা লড়াইয়ের ম্যাচ দেখছে।
এতসব নাটক, চুরি, মারামারি আর তুষারঝড়ের সঙ্গে লড়াই করার পর যখন একটা বাসা পুরোপুরি তৈরি হয়, তখন তাদের সংসারজীবন শুরু হয়। মজার ব্যাপার হলো, মানুষের মতো এরা সাধারণত এক সঙ্গীতেই বিশ্বাসী। প্রতিবছর একই সঙ্গীর সঙ্গে তারা নতুন করে ঘর বাঁধে এবং ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বড় করে।
আজকের দিনে আমরা সম্পর্কে জড়ানো আর ভাঙার যে দ্রুতগতি দেখি, তার চেয়ে অ্যান্টার্কটিকার এই পেঙ্গুইনগুলোর জীবনবোধ হয়তো কিছুটা হলেও আলাদা। তারা জানে, একটা ছোট্ট নুড়িপাথর জোগাড় করতে কত কষ্ট করতে হয়, আর সেই ঘর রক্ষা করতে গেলে প্রতিদিন কতটা লড়াই করতে হয়।
তাই পরের বার যখন ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দিয়ে ভাববেন দুনিয়ায় প্রেম বুঝি আর বেঁচে নেই, তখন অ্যান্টার্কটিকার ওই ছোট্ট পেঙ্গুইনটির কথা মনে করবেন, যে বরফের বুক চিরে নিজের ভালোবাসার মানুষটির জন্য আজও একটা নিখুঁত নুড়িপাথর খুঁজে চলেছে!
