হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হতে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে।
ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় নির্মাণ করা হচ্ছে বিশেষায়িত হাসপাতাল। কথা ছিল হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। এরপর তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। এখন বলা হচ্ছে, ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হতে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের পেছনে দোতলা বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। খুলনার গণপূর্ত বিভাগ-১-এর তত্ত্বাবধানে কাজটি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএন বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড। খুলনা মেডিকেল প্রাঙ্গণে নির্মিত হলেও এটি হবে স্বতন্ত্র হাসপাতাল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বহুতল ভবনের নতুন হাসপাতালটি চালু হলে খুলনা অঞ্চলের ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে। বর্তমানে এসব রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আবার কারও কারও যেতে হচ্ছে ঢাকা কিংবা অন্য কোথাও।
১৯ অক্টোবর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনটির মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন তলায় দরজা-জানালা, থাই গ্লাস ও টাইলস বসানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভবনের অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে। ভবনের বাইরের অংশে রং ও অন্যান্য ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। নির্মাণকাজ শেষে অস্থায়ী কাঠামো সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে।
খুলনার গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের পরিকল্পনাসহ নানা জটিলতার কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। তবে ভবনটির কাঠামোগত ও অন্যান্য নির্মাণকাজ মিলিয়ে অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ। আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
নানা সীমাবদ্ধতায় চলছে ক্যানসারের চিকিৎসা
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার বিভাগ চালু হয় ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর। শুরুতে এ বিভাগে শয্যা ছিল আটটি। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিভাগটিতে আলাদা পূর্ণাঙ্গ ভর্তির ব্যবস্থাও নেই। মূলত বহির্বিভাগে কেমোথেরাপিসহ সীমিত পরিসরে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

খুলনা মেডিকেলের ক্যানসার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বহির্বিভাগে দুটি পালায় ১২টি শয্যায় কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ওষুধ পাওয়া গেলে রোগীদের তা দেওয়া হয়। সরবরাহ না থাকলে রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়। রক্তের ক্যানসার ছাড়া অন্যান্য ধরনের ক্যানসারের রোগীদের সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। বছরে নতুন রোগী আসেন প্রায় দুই হাজার। পুরোনো রোগীদের ফলোআপসহ বছরে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ হাজারের বেশি।
ক্যানসার বিভাগের প্রধান চিকিৎসক মো. মুকিতুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতালটির ভবন নির্মাণ শেষ হলেই সেবা শুরু করা যাবে না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন, চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ এবং সেবা পরিচালনার প্রস্তুতি নিতে সময় লাগবে।
৩ দফায় বাড়ে মেয়াদ
২০১৯ সালে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে এর সঙ্গে কিডনি ও হৃদ্রোগের চিকিৎসাসেবা যুক্ত করা হয়। বাড়ানো হয় শয্যার সংখ্যাও।
খুলনায় ২৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভবন নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
সর্বশেষ মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। খুলনার এই বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তিমূল্য ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২৩ হাজার ২৫০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে নির্মিত ভবনটির মোট আয়তন প্রায় আড়াই লাখ বর্গফুট।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএন বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী শেখ দাউদ হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, কাজ শুরুর আগে নির্ধারিত জায়গায় থাকা পুরোনো স্থাপনা সরাতে হয়েছে। নকশা পেতেও দেরি হয়েছে। এ ছাড়া করোনা মহামারি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, বিদ্যুৎ-সংকট, ডেঙ্গু ও অর্থ বরাদ্দের জটিলতায় কাজের গতি ব্যাহত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অন্য কয়েকটি বিভাগের তুলনায় খুলনায় দরপত্রের প্রক্রিয়া শুরু করতেও প্রায় এক বছর দেরি হয়েছিল। কাজের মধ্যে বরাদ্দের টাকা শেষ হয়ে গেলে নতুন অর্থছাড়ের অপেক্ষায় থাকতে হয়।
কোন তলায় কী চিকিৎসা
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্মাণাধীন হাসপাতালের নতুন ভবনে মোট ৪৫০টি শয্যা থাকবে। ভবনটির বেজমেন্টের দ্বিতীয় তলা থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত থাকবে ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা। সেখানে লিনিয়ার এক্সিলারেটর, সিটি সিমুলেটর, ব্র্যাকিথেরাপি ও কেমোথেরাপিসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। এই ইউনিটে শয্যা থাকবে ১৮২টি।
অষ্টম থেকে একাদশ তলা পর্যন্ত থাকবে কিডনি রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা। সেখানে ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার কক্ষ, অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের পরিচর্যা ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ইউনিটে থাকবে ১৫৬টি শয্যা।
দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ তলা পর্যন্ত থাকবে হৃদ্রোগের চিকিৎসাসেবা। এখানে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), আইসিইউ, হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচার কক্ষ, শিশুদের হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচার এবং ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবরেটরি (ক্যাথল্যাব) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ইউনিটে থাকবে ১১২টি শয্যা।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, নতুন হাসপাতালটি চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার দুয়ার খুলবে।