আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষিত বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেনকে এবার একই সিটি করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গতকাল রোববার স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষিত বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেনকে এবার একই সিটি করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গতকাল রোববার স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে আদালতের রায়ে মেয়রের দায়িত্ব পাওয়া শাহাদাত হোসেন এখন সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসক হিসেবেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব জুয়েল রানা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ৪ অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শাহাদাত হোসেন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করবেন। এ দায়িত্বের বিপরীতে তিনি বিধি অনুযায়ী মাসিক সম্মানী ও অন্যান্য ভাতা পাবেন। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে গত মার্চেও শাহাদাত হোসেনকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব তৈরি করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে সে সময় এ বিষয়ে কোনো আদেশ জারি করা হয়নি। নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং মেয়র হিসেবে শাহাদাত হোসেনের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে এবার তাকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলো।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ ও শাহাদাত হোসেনের দায়িত্ব পালন নিয়ে গত ২৭ এপ্রিল একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের নথির বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছিলেন শাহাদাত হোসেন। দৈনিকটির কাছে তিনি দাবি করেছিলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী মেয়র হিসেবে তার মেয়াদ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের নথিতে বলা হয়েছিল, আদালত তাঁকে মেয়র ঘোষণা করলেও তাঁর মেয়াদের বিষয়ে আলাদা কোনো নির্দেশনা দেননি।
এ অবস্থায় মেয়র হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এর মধ্যে গত মার্চে তাঁকে পূর্ণকালীন প্রশাসক করার প্রস্তাব তৈরি হলেও তা কার্যকর হয়নি। এর আগে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ হিসেবে গত ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ।
বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, রেজাউল করিম চৌধুরী পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শাহাদাত হোসেনের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয়েছিল ৫২ হাজার ৪৮৯।
তবে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল বাতিলের দাবিতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত হোসেন। ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি করা ওই মামলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নয়জনকে বিবাদী করা হয়।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর মামলাটির রায় দেন চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমীন। রায়ে রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করে শাহাদাত হোসেনকে মেয়র নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে ১০ দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন আদালত।
আদালতের নির্দেশনার পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে ৩ নভেম্বর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলনকক্ষে মেয়র হিসেবে শপথ নেন তিনি। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ তাঁকে শপথ পড়ান। এভাবে নির্বাচনের প্রায় তিন বছর নয় মাস পর মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিক সুযোগ পান শাহাদাত হোসেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. তোফায়েল ইসলামকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।
পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমে শাহাদাত হোসেন মেয়র ঘোষিত হন এবং শপথ গ্রহণ করেন। তবে নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ, মেয়র হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে এবার তাকে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
সরকারের সর্বশেষ এ সিদ্ধান্তের ফলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক দায়িত্বে শাহাদাত হোসেনের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারিত হলো। আদালতের রায়ে মেয়র ঘোষিত হওয়ার পর এবার সরকারের প্রজ্ঞাপনে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পথচলায় নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
