বাঙালির জাতীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক একটি অনিবার্য অধ্যায়। দেশের কোটি কোটি মানুষের দুঃখকে আপন বক্ষে ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্যপূর্ব ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তি-জীবনে মানবিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন করে তিনি আপন হৃদয়কে করেছিলেন উদার মানবিকতায় পরিপূর্ণ। তাই তার কর্মজীবনের আদর্শ ছিলÑ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’
ছেলেবেলা থেকেই শেরে বাংলার নাড়ির টান ছিল গ্রাম-বাংলায়। কৃষক প্রজার দুঃখ বেদনার সঙ্গে তার পরিচয় কোনো পুঁথিগত বিদ্যা মারফত হয়নি। তিনি জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচার বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ করেন। অনুভব করেন জমিদার মহাজনি প্রথা উচ্ছেদ করতে না পারলে বাংলাদেশের কৃষক প্রজার মুক্তি নেই। রাজনীতিতে প্রবেশের শুরুতেই গ্রাম-বাংলার প্রধান এ সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ পথে শেরে বাংলার অদম্য জ্ঞান-পিপাসা, ক্ষুরদার মনীষা, যুক্তি-তর্কের সাহায্যে মত খ-ন ও নিজ মত প্রতিষ্ঠার আশ্চর্য ক্ষমতা তাকে শিগগিরই ছাত্র জগতের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে তুলল। আপন মহিমায় উদ্ভাসী রাজনীতিবিদ, মানবপ্রেমী ও দেশনেতা শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক বরিশাল জেলার চাখার গ্রামের এক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ওয়াজেদ আলী সাহেব ছিলেন বরিশালের খ্যাতিমান আইনজীবী। সমুজ্জ্বল আদর্শ আর পারিবারিক ঐতিহ্যে লালিত পালিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে তুলেছিলেন ফজলুল হক তার নিজের জীবন। জীবনের শুরু থেকেই তার তীক্ষè মেধা শক্তি, কুশাগ্র বুদ্ধিমত্তা ও তেজস্বীতার স্ফুরণ ঘটে। তিনি বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ঢাকা বিভাগীয় ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে, প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৮৯৪ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিন বিষয়ে অনার্সসহ ডিগ্রি লাভ করেন এবং এর পরের বছরেই গণিত বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ পাস করেন। ১৮৯৭ সালে তিনি আইন বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ডিগ্রি নেন। কর্মজীবনে ফজলুল হক প্রথমে কিছুদিন কলেজে অধ্যাপনার পর ১৯০০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এ সময় তিনি দেশবরেণ্য পন্ডিত ও প্রজ্ঞাভাস্বর মনীষী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। ১৯০৬ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি ব্যাধি জর্জরিত, দুঃখ-দৈন্য-ঋণ পীড়িত দরিদ্র গ্রাম-বাসীর দুর্দশা ও লাঞ্ছনার বহু নিষ্করুণ ঘটনা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পান। আপামর জনতার এ করুণ অবস্থার প্রতিকারের ব্রত নিয়ে মানবপ্রেমী ফজলুল হক জনসেবা ও রাজনীতিতে অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। আইন ব্যবসাই এ উদ্দেশ্য পূরণের প্রশস্ত ক্ষেত্র ভেবে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। একই বছরের (১৯০৬) ডিসেম্বরে ঢাকার শাহবাগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলন হয়। একে উপলক্ষ্য করে ফজলুল হকের রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে। তিনি রাজনীতির সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ ঘটিয়ে পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সমাজের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেন।
১৯১৩ সালে ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য হন। তখন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তারপর থেকে একটানা ভারত বিভাগের সময় পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের আইন সভার সদস্য ছিলেন। ১৯১৩ সালে ঢাকা বিভাগীয় কেন্দ্রের উপনির্বাচনে হিন্দু- সংখ্যাধিক্য এলাকায় হিন্দু প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার একমাত্র কারণ হলোÑ তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ও স্বদেশি যুগের প্রখ্যাত নেতা অশ্বিনী কুমার দত্তের স্নেহাশীর্বাদ। এভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ভর করে এ কে ফজলুল হক হয়ে ওঠেন শেরে বাংলা। হয়ে ওঠেন হিন্দু- মুসলমানসহ সকল সম্প্রদায়ের প্রাণপ্রিয় নেতা।
১৯১৪ সালে স্যার সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর তাকে বাংলাদেশের মুসলিম লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। এ সময় তিনি জাতীয় কংগ্রেসেও যোগদান করেন এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বপদে আসীন হন। একই সঙ্গে লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে থেকে দেশের সেবা করেন। ১৯১৮ সালে তিনি সারা ভারত মুসলিম লীগের দিল্লি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। এখানে তিনি সভাপতির ভাষণে ভারতের মুসলমানদের দুঃখ-বেদনার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি রমেশ চন্দ্র দত্তের গ্রন্থসমূহ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন ব্রিটিশ শাসনের ফলেই ভারত এক দরিদ্র দেশে পরিণত হয়েছে। তিনি এ সময় রমেশ দত্তের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হন। তিনি বলেন, ‘হিন্দুরা মুসলমানের শত্রু নন, মুসলমানরাও হিন্দুদের শক্র মনে করা উচিত নয়। শিক্ষার অভাবে ও অন্য কারণে ধর্মান্ধতা দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে দানা বেঁধে আছে। তাই তারা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন না। এ কারণে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তারা লিপ্ত হন। শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মন প্রসারিত হবে এবং পরস্পরের মধ্যে সহনশীলতাভাব জাগ্রত হবে।’ আর হিন্দু জমিদার মহাজন, আইনজীবী প্রভৃতির শোষণ ও পীড়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, এ শোষণ-পীড়ন কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য নয়। সমভাবে মুসলমান জমিদার মহাজন আইনজীবী প্রভৃতিও পীড়ন করে থাকেন।
১৯১৫ সালে বরিশালের মুসলমান ও নমঃশুদ্র কৃষক প্রজাদের সংঘবদ্ধ করতে চেষ্টা করেন। ১৯২১ সালে তার অনুপ্রেরণায় গৌর নদীর আগৈলঝারায় এক প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলমান ও নমঃশুদ্র কৃষক প্রজা একই সঙ্গে মিছিল করে এ সভায় যোগদান করে। এ আন্দোলনে কৃষক প্রজাদের জয় হয়। জমিদার মহাজনরা হার মানতে বাধ্য হয়। এটা ফজলুল হককে খুবই অনুপ্রাণিত করে। তিনি ১৯২৯ সালে কৃষক প্রজাদের আন্দোলনকে আরও সুসংহত রূপ দেওয়ার জন্য গঠন করেন নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা সমিতি। ফজলুল হক সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে যোগদান করলেও তার দৃষ্টি সীমিত ছিল বাংলাদেশেই। তিনি উপলব্ধি করেন সর্বভারতীয় আন্দোলনের সুযোগ গ্রহণ করে অবাঙালি নেতৃবৃন্দ অন্যান্য প্রদেশে নিজেদের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে ব্যস্ত এবং তারা এ উদ্দেশ্য সাধনেই বাংলাদেশকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেন। স্বভাবতই তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হন।
১৯১৩ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন। ১৯২০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত তিনি মন্টেগু চেমস-ফোর্ড সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত সাল পর্যন্ত তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সেক্রেটারি এবং ১৯১৭ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এর সভাপতি ছিলেন। ১৯২৫ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯১৮ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে তিনি কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩১ সালে এবং ১৯৩১ থেকে ১৯৩২ সালে তিনি লন্ডনে গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেন। তখন থেকেই তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী হন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা করপোরেশনের মেয়র হন। ১৯৩৭ সালে এ কে ফজলুল হক বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৪৩ সালে পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি জনস্বার্থে বহু হিতকর কার্য সাধন করেন। বাংলার কৃষক-প্রজাদের উন্নতিকল্পে তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কৃষক-মহাজনদের ঋণ থেকে মুক্তিদানের জন্য হক সাহেব ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেন, কৃষি খাতক আইন পাস করেন এবং ঋণের পরিমাণ ৯০০ কোটি টাকা থেকে ৬০ কোটি টাকায় হ্রাস করেন। কৃষিজীবী আইন দ্বারা সুদের ব্যবসার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় এবং কৃষককুলকে সুদের অভিশাপ থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করা তার প্রধান নির্বাচনি কর্মসূচি হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা পুরোপুরি সমাধা করতে পারেননি। কারণ তার সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী ছিলেন জমিদার শ্রেণির। মুসলমানদের শিক্ষার উন্নতির জন্যও ফজলুল হক অনেক প্রচেষ্টা চালান। কলকাতায় তিনি একটি কেন্দ্রীয় মুসলিম শিক্ষা সমিতি গঠন করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতার মুসলমান ছাত্রদের জন্য কারমাইকেল হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালান। ১৯২৪ এ কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
দেশ বিভাগের পরও শেরে বাংলার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এতটুকু পরিবর্তন ঘটেনি। এক ভাষণে তিনি বলেন, বাঙালি এক অখ- জাতি। তারা একই ভাষায় কথা বলে এবং একই সুসংহত দেশে বসবাস করে। তাদের আদর্শ এক এবং জীবনধারণের প্রণালিও এক। বাংলা অনেক বিষয়ে সারা ভারতকে পথ দেখিয়েছেন এবং দেশ বিভাগ সত্ত্বেও জনসাধারণ তথাকথিত নেতৃবৃন্দের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি ত্যাগ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্ব নেন। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অধঃপতন দেখে আবার ১৯৫৪ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার দলের যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রের ফলে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে যায়। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। আরও পরে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারি হওয়া পর্যন্ত তিনি এ পদে আসীন থাকেন। এ সময় তিনি কারারুদ্ধও হন। ১৯৫৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’ ডিগ্রিতে ভূষিত হন। দেশের জন্য বিশেষ করে অবহেলিত দারিদ্র্যপীড়িত আপামর বাংলার কৃষক সমাজের জন্য ফজলুল হক যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন, তা আর কোনো নেতার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
বাঙালি জনসাধারণ তাদের প্রিয় হক সাহেবকে কোনোদিনই ভুলতে পারবে না। ফজলুল হক শুধু একটি নাম নয়। তিনি নিপীড়ন আর বিভেদ পন্থার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তা, ঔদার্য ও সংস্কারমুক্ত মনের মূর্তপ্রতীক। মুক্ত বাংলার জয়গান তারই কণ্ঠে প্রথম ধ্বনিত হয়। চিন্তায় ও নিষ্ঠায়, কর্মে ও সাধনায়, বীর্যে ও বলিষ্ঠতায় তিনি ছিলেন এক কর্মী পুরুষ একজন শক্তিমান সিংহ পুরুষ। তার মতো একজন শক্তিমান কর্মী পুরুষের বড় প্রয়োজন আজ যিনি তার বিশাল স্কন্ধে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ার ভার বহন করতে পারেন।
