২৮ অক্টোবর লগি বৈঠার তাণ্ডবে গুরুতর আহত হয়েছিলেন সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। সজ্ঞাহীন অবস্থায় ৫ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
সাক্ষাৎকার
২৮ অক্টোবর লগি বৈঠার তাণ্ডবে গুরুতর আহত হয়েছিলেন সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। সজ্ঞাহীন অবস্থায় ৫ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। পল্টন ট্রাজেডির দুই দশক উপলক্ষে দেয়া বিশেষ সাক্ষাতকারে তার মা শামছুন নাহার রুবি বলেছেন, ইসলামের দুশমনরা মাসুম, শিপন, মুজাহিদদের হত্যা করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাজকে বন্ধ করে রাখতে পারেনি। ওরা নেই, দুনিয়ায় ওদের হারানো শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে শত শত মাসুম, শিপন, মুজাহিদ এগিয়ে আসছে ওদের শূন্যস্থান দখল করার জন্য। এই ইসলামী কাফেলার স্রোতকে দুনিয়ার কোনো শক্তি রোধ করতে পারবে না।
সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন আবু সালেহ তোহা।
দৈনিক সংগ্রাম : শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের জীবনের লক্ষ্য কী ছিল?
শামছুন নাহার রুবি : ওর জীবনের লক্ষ্য ছিল সে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করবে এবং প্রচুর শিক্ষিত হয়ে ইসলামের জন্য নিজের জীবনটাকে উৎসর্গ করবে।
দৈনিক সংগ্রাম: আপনি তাকে ইসলামী ছাত্রশিবিরে কেন যোগদান করিয়েছিলেন?
শামছুন নাহার রুবি : আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলে যেন ভালো মানুষ হয়, সৎ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে দেশে গড়ে উঠতে পারে এবং দেশের মঙ্গল করতে পারে। ইসলামী ছাত্রশিবির ছাড়া বাংলাদেশে এমন কোনো সংগঠন ছিল না যার ওপর আমার আস্থা থাকবে। কারণ আমার ভাইয়েরাও এই পথেই ছিল এবং তারা সৎ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সেই প্রত্যাশায় আমি নিজেই তাকে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করিয়েছিলাম।
দৈনিক সংগ্রাম : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময়কার কোনো স্মৃতি কি আপনার মনে আছে?
শামছুন নাহার রুবি : সেদিন ও পল্টনের প্রোগ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি নাস্তা তৈরি করার আগেই সে বের হয়ে যাচ্ছিল, তাই তাড়াতাড়ি করে ওকে দুইটা ডিম সিদ্ধ দিয়েছিলাম যাতে ক্ষুধা কম লাগে। আমাদের বাসায় শহীদ শিপন এসেছিল। ও আর শিপন মিলে দুইটা ডিম খেয়ে পল্টনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যাওয়ার সময় আমার সাথে আর কোনো কথা হয়নি, আমিও ব্যস্ত ছিলাম এবং ও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
দৈনিক সংগ্রাম : তাঁর শাহাদাতের খবর আপনি কীভাবে পেয়েছিলেন এবং সেদিনের ঘটনাটি কী ছিল?
শামছুন নাহার রুবি : মুগদার একটি মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাআমার খালাম্মা আমাকে ফোন দিয়ে পল্টনের ঘটনার কথা জানান। পরে ওদের দায়িত্বশীলের মাধ্যমে জানতে পারি যে ও পল্টনে আহত হয়েছে। ২৮ অক্টোবর দুপুরবেলা সে আহত হয়। প্রথমে কাকরাইলে এবং পরে ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে তাকে ভর্তি করা হয়। পাথর মেরে ওর মাথার খুলি মগজের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কারণে ও স্পটেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অজ্ঞান অবস্থায় পাঁচ দিন থাকার পর ২ নভেম্বর ভোর ৩:৪৫ মিনিটের দিকে সে আল্লাহর কাছে চলে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে কথা বলতে পারেনি, কারণ তার জ্ঞান আর ফেরেনি।
দৈনিক সংগ্রাম : বিচার নিয়ে বর্তমান সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
শামছুন নাহার রুবি : বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে আমরা বিচার চেয়ে আসছি কিন্তু বিচার পাইনি। নতুন সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু এখন আর কোনো আশা দেখছি না। এই সরকারও আওয়ামী লীগের মতোই আচরণ করছে। একসময় তারা জোটে আমাদের বন্ধুর মতো ছিল, কিন্তু এখন শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তাদের মাঝে আওয়ামী লীগের আচরণই দেখতে পাচ্ছি, তাই তাদের কাছে বিচার প্রত্যাশা করে লাভ হবে বলে মনে হয় না। তারা সেই পথে এগোচ্ছে না, বরং আবার নির্যাতন শুরু করেছে।
দৈনিক সংগ্রাম: আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতি করার বিষয়ে একজন শহীদের মা হিসেবে আপনার মতামত কী?
শামছুন নাহার রুবি : তাদের আর কখনো বাংলাদেশে রাজনীতি করার প্রশ্নই ওঠে না। তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের গুণাগুন হারিয়ে ফেলেছে।
রাজনীতি করার মানে হলো আল্লাহর ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা, যা তাদের মাঝে নেই। আমরা জীবন দিয়ে হলেও তাদের প্রতিহত করব। আমার সন্তান জনগণের কল্যাণের জন্যই জীবন দিয়েছে, এতে আমার কোনো আফসোস নেই।
দৈনিক সংগ্রাম: ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ক্যাম্পাস নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
শামছুন নাহার রুবি : ছাত্রশিবির মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। আপামর জনতা ও ছাত্ররা তাদের চিনেছে যে তারা সৎ ও যোগ্য নাগরিক। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার জন্য ছাত্রশিবিরের প্যানেলকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছে।
আমি এমন একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস প্রত্যাশা করি যা সন্ত্রাস, বাধা ও অত্যাচারমুক্ত থাকবে, যেখানে ছেলেমেয়েরা স্বাধীনভাবে ও আনন্দের সাথে পড়াশোনা করতে পারবে এবং নিজেদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
ইসলামের দুশমনরা মাসুম, শিপন, মুজাহিদদের হত্যা করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাজকে বন্ধ করে রাখতে পারেনি।
ওরা নেই, দুনিয়ায় ওদের হারানো শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে শত শত মাসুম, শিপন, মুজাহিদ এগিয়ে আসছে ওদের শূন্যস্থান দখল করার জন্য। এই ইসলামী কাফেলার স্রোতকে দুনিয়ার কোনো শক্তি রোধ করতে পারবে না। আল্লাহর পথে বাধা দিতে গিয়ে তারাই ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে ফেরাউন ও নমরূদের মত।
এই আটাশে অক্টোবরে নতুন করে শহীদদের আত্মদানের কথা স্মরণ করে আমাদের দ্বীন কায়েমের পথ চলা হোক আরো বেগবান। আর চোখের পানি নয়, আওয়ামী হায়েনাদের বিষাক্ত ছোবল থেকে দেশের ঈমানদার জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব আজ আমাদের অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ওপর।
দৈনিক সংগ্রাম: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
