স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কত টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে, তা নয়; বরং সেই কেনাকাটায় দুর্নীতি করার সুযোগ বন্ধ করা হচ্ছে কি না। জনগণের অর্থ ব্যয় হবে রোগীর চিকিৎসার জন্যÑকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর অনৈতিক লাভের জন্য নয়। তাই কেনাকাটার আয়োজনের পাশাপাশি এমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেউ একক ক্ষমতায় শর্ত বদলাতে, দাম বাড়াতে, নিম্ন মানের পণ্য গ্রহণ করাতে কিংবা সরবরাহ ছাড়াই বিল তুলতে না পারেন।
দুর্নীতি হয়ে যাওয়ার পর তদন্ত ও শাস্তি প্রয়োজন। কিন্তু তত দিনে রাষ্ট্রের অর্থের ক্ষতি হয়, রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হন এবং দায় নির্ধারণে দীর্ঘ সময় চলে যায়। সুতরাং মূল গুরুত্ব দিতে হবে দুর্নীতি ঘটার আগেই তা প্রতিরোধে। কোনো ব্যবস্থাই শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না; তবে ক্ষমতার বিভাজন, স্বাধীন যাচাই, তথ্য প্রকাশ এবং কার্যকর দায়বদ্ধতা দুর্নীতির সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত করতে পারে।
চাহিদা তৈরির পর্যায় থেকেই নিয়ন্ত্রণ
দুর্নীতি ঠেকানোর প্রথম ধাপ হলো অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বন্ধ করা। কোনো হাসপাতালে যন্ত্র প্রয়োজন নেই, চালানোর জনবল নেই কিংবা একই যন্ত্র মেরামত যোগ্য অবস্থায় পড়ে আছেÑতারপরও নতুন যন্ত্র কেনার প্রস্তাব এলে সেটি যাচাই ছাড়া অনুমোদন করা যাবে না।
প্রতিটি বড় ক্রয়ের সঙ্গে প্রয়োজনের লিখিত ব্যাখ্যা থাকতে হবে। সেখানে বিদ্যমান যন্ত্রের অবস্থা, রোগীর চাহিদা, সম্ভাব্য ব্যবহার, জনবল, অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞের মতামত ছাড়া শুধু প্রশাসনিক চাহিদা পত্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
চাহিদা যারা তৈরি করবেন, অনুমোদন ও স্বাধীন যাচাইয়ের দায়িত্ব তাদের বাইরে রাখতে হবে। এতে অযৌক্তিক প্রস্তাব শুরুতেই আটকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্র সাজানো যাবে না
দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ দুর্নীতি প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এমন শর্ত দেওয়া যাবে না, যা চিকিৎসা সেবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়, অথচ নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে সুবিধা দেয়।
কারিগরি শর্ত হবে কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও সেবার প্রয়োজন ভিত্তিক। অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য, অযৌক্তিক অভিজ্ঞতা কিংবা সীমিত যোগ্যতার শর্ত দিয়ে প্রতিযোগিতা সংকুচিত করা বন্ধ করতে হবে। বিশেষ প্রযুক্তি বা বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রয়োজন হলে তার যুক্তি লিখিত ভাবে সংরক্ষণ এবং স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
দরপত্র প্রকাশের পর শর্ত পরিবর্তন করলেও কে পরিবর্তন করেছেন, কেন করেছেন এবং কার অনুমোদনে করেছেনÑতার রেকর্ড থাকতে হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন যেন অদৃশ্য ভাবে করা না যায়।
একই হাতে পুরো প্রক্রিয়ার ক্ষমতা নয়
চাহিদা নির্ধারণ, দরপত্র মূল্যায়ন, পণ্য গ্রহণ এবং বিল অনুমোদনÑসবকিছু একই ব্যক্তি বা ছোট একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকলে অনিয়ম আড়াল করার সুযোগ বাড়ে।
তাই দায়িত্ব পৃথক করতে হবে। যারা দরপত্র মূল্যায়ন করবেন, তারাই যেন একক ভাবে পণ্যের মান নিশ্চিত করে বিল ছাড়ের সিদ্ধান্ত না দেন। উচ্চ মূল্যের ক্রয়ে গ্রহণ ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য পৃথক, স্বার্থের সংঘাত মুক্ত বিশেষজ্ঞ দল থাকতে হবে।
প্রতিটি সিদ্ধান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, পদবি, তারিখ ও যুক্তি নথিবদ্ধ থাকবে। কমিটির যৌথ সিদ্ধান্তের আড়ালে যেন ব্যক্তিগত দায়িত্ব হারিয়ে না যায়। একই সঙ্গে সৎ ভাবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অযৌক্তিক চাপ ও হয়রানি থেকেও সুরক্ষা দিতে হবে।
প্রকৃত মালিকানা ও স্বার্থের সম্পর্ক যাচাই
কাগজে আলাদা প্রতিষ্ঠান হলেও সেগুলো একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কি না, তা যাচাই প্রয়োজন। প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছাড়া একাধিক দরপত্র জমা পড়লেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না।
ক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের স্বার্থের সংঘাতের ঘোষণা দিতে হবে। কোনো দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক, ব্যবসায়িক বা প্রাসঙ্গিক পারিবারিক সম্পর্ক থাকলে তা জানাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাওয়া, অস্বাভাবিক ভাবে কাছাকাছি দর কিংবা ঘুরে ঘুরে একই গোষ্ঠীর জয়Ñএসবকে অতিরিক্ত যাচাইয়ের সংকেত হিসেবে নিতে হবে। তবে সন্দেহকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার না করে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দাম বাড়ানোর সুযোগ বন্ধ করতে তুলনামূলক যাচাই
যন্ত্রের দাম যাচাই শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কোটেশন সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তুলনীয় সরকারি ক্রয়, প্রস্তুতকারকের তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্য মিলিয়ে মূল্যের যৌক্তিকতা পরীক্ষা করতে হবে।
শুধু ক্রয় মূল্য নয়, রিএজেন্ট, ব্যবহার্য সামগ্রী, সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ সহ পুরো ব্যবহারকালীন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। কম দামে যন্ত্র দিয়ে পরে অপরিহার্য সামগ্রীর অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ চুক্তির শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অস্বাভাবিক কম দরও যাচাই প্রয়োজন। সেই দামে চুক্তির মান বজায় রেখে সরবরাহ সম্ভব কি না, তা না দেখলে পরে নিম্ন মানের পণ্য বা অতিরিক্ত অর্থ দাবির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
যাচাই ছাড়া গ্রহণপত্র নয়, প্রমাণ ছাড়া বিল নয়
দুর্নীতি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর বাধাগুলোর একটি হতে হবে পণ্য গ্রহণ ও অর্থ পরিশোধের পর্যায়ে।
চুক্তি অনুযায়ী পণ্য না এলে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না হলে কিংবা কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সংশ্লিষ্ট গ্রহণপত্র দেওয়া যাবে না। যন্ত্রের মডেল, সিরিয়াল নম্বর, সক্ষমতা, আনুষঙ্গিক সামগ্রী, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের তথ্য যাচাই করতে হবে।
বিল ছাড়ের আগে ক্রয়াদেশ, বাস্তব সরবরাহ ও গ্রহণের প্রমাণ এবং বিলের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। একই পণ্যের বিপরীতে একাধিক বিল বা অসম্পূর্ণ সরবরাহের জন্য পূর্ণ অর্থ পরিশোধ শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অর্থ পরিশোধের শর্ত চুক্তিতেই স্পষ্ট থাকতে হবে। যথাযথ সরবরাহের পর বিল আটকে রেখে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।=
চুক্তির পর দাম ও কাজ পরিবর্তনেও নজরদারি
দরপত্রের সময় কম মূল্য দেখিয়ে কাজ পাওয়ার পর অযৌক্তিক ভাবে ব্যয় বাড়ানো, পণ্যের মান পরিবর্তন কিংবা সময় বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
প্রতিটি সংশোধনের প্রয়োজন, আর্থিক প্রভাব ও অনুমোদনের ভিত্তি লিখিত থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্বাধীন পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে এবং প্রকাশযোগ্য তথ্য জনগণকে জানাতে হবে।
সরবরাহকারী নিজে সময়সীমা ভঙ্গ করলে তার দায় আর হাসপাতালের প্রস্তুতির ঘাটতিতে বিলম্ব হলে তার দায় আলাদা ভাবে নির্ধারণ করতে হবে। প্রকৃত কারণ যাচাই ছাড়া কাউকে ছাড় দেওয়া বা দায়ী করাÑদুটিই অনুচিত।
তথ্য প্রকাশ হোক নিয়ম, গোপন রাখা নয়
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রতিটি বড় ক্রয়ের অনুসন্ধানযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। কোন হাসপাতালের জন্য কী কেনা হচ্ছে, কারা কাজ পেয়েছেন, একক ও মোট মূল্য কত, কবে সরবরাহ হওয়ার কথা এবং কত টাকা পরিশোধ হয়েছেÑএসব প্রকাশযোগ্য তথ্য সহজে পাওয়া যেতে হবে।
চুক্তি সংশোধন, অতিরিক্ত ব্যয়, সময় বৃদ্ধি, স্থাপন এবং যন্ত্র সচল হওয়ার অবস্থাও জানাতে হবে। আইনসম্মত গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা বজায় রেখে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণ, গণমাধ্যম ও গবেষকেরা তথ্য তুলনা করতে পারলে অস্বাভাবিক মূল্য ও বিলম্ব শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে। শুধু পিডিএফ আপলোড নয়, ব্যবহারযোগ্য ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
রক্ষণাবেক্ষণের নামেও যেন অর্থ অপচয় না হয়
যন্ত্র কেনার পর দুর্নীতির ঝুঁকি শেষ হয় না। রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও সার্ভিস বিলও যাচাইয়ের আওতায় রাখতে হবে।
কোন যন্ত্রাংশ বদলানো হয়েছে, কেন প্রয়োজন হয়েছে, ওয়ারেন্টির মধ্যে ছিল কি না এবং কাজের পর যন্ত্র সচল হয়েছে কি নাÑতার প্রমাণ থাকতে হবে। একই কাজের জন্য ওয়ারেন্টি সেবা ও আলাদা বিলের মাধ্যমে দ্বৈত অর্থ আদায় ঠেকাতে হবে।
সরবরাহকারীর সার্ভিস রিপোর্টের পাশাপাশি হাসপাতালের ব্যবহারকারী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কারিগরি কর্মীর যাচাই থাকতে হবে। যন্ত্রের সচল ও অচল থাকার সময়ও নথিবদ্ধ করতে হবে।
অভিযোগে সুরক্ষা, প্রমাণিত অনিয়মে ব্যবস্থা
অনিয়মের তথ্য জানাতে নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। অভিযোগ পাওয়ার পর তা অনুসরণ, প্রাথমিক যাচাই এবং নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। তথ্যদাতা যেন প্রতিশোধ মূলক হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধু সরবরাহকারী নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অনুমোদনকারীর ভূমিকাও পরীক্ষা করতে হবে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় ক্ষতি আদায়, চুক্তিগত প্রতিকার এবং প্রযোজ্য আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ মাত্রই কাউকে দোষী ধরে নেওয়া যাবে না।
নজরদারির লক্ষ্য হবে অনিয়ম প্রতিরোধ ও সংশোধনÑজরুরি চিকিৎসা সামগ্রীরর সরবরাহ অযথা বন্ধ করা নয়।
জবাবদিহিতার শেষ প্রশ্ন: রোগী কী পেলেন?
স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিতে। কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑকতটি যন্ত্র চালু হয়েছে, কতজন রোগী সেবা পেয়েছেন এবং চিকিৎসার অপেক্ষা ও ব্যয় কতটা কমেছে।
স্বচ্ছতা কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। এমন ব্যবস্থা চাই, যেখানে সিদ্ধান্ত যাচাই করা যায়, তথ্য লুকানো কঠিন হয় এবং অনিয়মের দায় এড়ানো সহজ না হয়।
জনগণের অর্থ সুরক্ষার জন্য দুর্নীতি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি করার সুযোগই সংকুচিত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটার প্রতিটি ধাপে এই নীতিই হোক প্রধান শর্ত।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)।
