নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রায় সাড়ে চার মাস রাজউকের সদস্য হিসাবে কাজ করে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম। যোগদানের পরপরই নিয়েছেন কিছু কঠোর পদক্ষেপ এবং জানিয়েছেন রাজধানীর বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের পরিকল্পনার কথা। সহজ করে দিয়েছেন সেবা গ্রহীতাদের সাক্ষাৎ। এতে মানুষের মধ্যে নিজেদের কাজ নিজেরা নিয়ে আসার প্রবণতা বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও যে কোনো গ্রাহক তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে রাজউকে তাঁর সঙ্গেও খুব সহজে দেখা করতে পারবেন; নিয়েছেন সেই ব্যবস্থাও। এতে দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ হবেন।
কর্মকর্তা কর্মচারীদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন যাতে রাজধানীবাসীর সেবা সহজ করতে সততা, দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বলেন, দ্রুততার সঙ্গে কাজ না করলে সেখানে দুর্নীতি ঢুকে পড়ে। নিখুঁত ফাইলের কাজ স্লো হলেও সেখানে টাকা খরচ করে তা করিয়ে নিতে চায় মানুষ। একইসঙ্গে রাজউকের বিষয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণারও পরিবর্তন করতে সততার সঙ্গে জনগণের কাছে ঝামেলামুক্তভাবে সেবা পৌঁছাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি জার্মানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই যুগান্তর পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাজউকের সমস্যা বহুবিধ। গোড়ায় গলদ রয়েছে; আইন-বিধিও পূর্ণাঙ্গ নয়। রয়েছে স্ববিরোধিতাও। এছাড়া এখানে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। জনগণ এবং রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দুর্নীতি হচ্ছে। এতে দুইপক্ষ লাভবান হলেও ক্ষতি হয় শহরের। ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে এ ধরনের দুর্নীতি হয়ে থাকে।
অন্যান্য বিভাগের কী অবস্থা জানতে চাইলে বলেন,
অন্যান্য বিভাগেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। তবে দুর্নীতির বড় ক্ষেত্র সম্পত্তি বিভাগ। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ওই বিভাগে প্রায় সাড়ে চার মাস সদস্য (এস্টেট) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। সে সময় এ বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছি। থার্ড পার্টি বা দালালচক্র ওই বিভাগের বড় সমস্যা।
যে ধরনের দুর্নীতি হয় সম্পত্তি বিভাগে তা বলতে গিয়ে বলেন, পূর্বাচল প্রকল্পের কথাই বলি। সেখানে হতদরিদ্র মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৮ হাজার প্লটও দিয়েছে রাজউক। এরমধ্যে ২ হাজার প্লটও ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে নেই। ক্ষতিগ্রস্তরা প্লট বরাদ্দ পাওয়ার আগেই সামান্য কিছু টাকা দিয়ে দালালরা নিজেদের নামে চুক্তি করে নিয়েছেন। দালালরা তাদেরকে ভয় দেখিয়েছেন; ওই প্লট তারা পাবে না। ডিসি অফিসে যেতে হবে, রাজউকে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হতে হবে। এভাবে নানাকিছু বুঝিয়ে তাদের প্লটগুলো নামমাত্র মূল্যে কিনে উচ্চ দরে বিক্রি করেছে।
তিনি বলেন, বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে জনগণের সেবা সহজ করতে একটি পাইলট প্রজেক্ট করে কাজ শুরু করা হবে। সেখানে রাজউকের আইনি দূর্বলতা নিরসন ও বিধিবহির্ভূত নির্মাণ বন্ধে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে বেদখল জমি উদ্ধারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এখনো রাজউকের বেশ কিছু জমি বেদখল রয়েছে; উত্তরা, গুলশান, পূর্বাচল, বাড্ডা, কেরানীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জে। ওইসব জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় হাজার কোটি টাকা। সে সব জমি উদ্ধার করে ফ্ল্যাট করে বরাদ্দ দেওয়া হবে। কেননা, এখন আর মানুষকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রীয় অবদানের নামে প্লট বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় অবদানের কথা বলে যে আইনবলে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হতো; সেটা বাতিল করা হয়েছে। ইতোপূর্বে ড্রাইভার, চাকরদেরও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্লট দেওয়া হয়েছে। এখন আর এমপি, মন্ত্রীরাও রাষ্ট্রীয় অবদানের কোটায় প্লট পাবেন না। গত বছরের ২৮ নভেম্বর ওই আইনের সংশোধন করা হয়েছে। রাজউক শক্তিশালী করতে অন্যান্য আইনের সংশোধনের কাজও চলছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) কাজও শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দের কোটাও বাতিল করা হয়েছে।
উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের রাজউক কি বিদ্যমান ভূমিকা পালন করবে; সে বিষয়ে বলেন, শুধু ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে আমরা অফিসে বসে থাকব না। চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা নিজেরাও এখন থেকে মাঠে থাকব। মাঠ পর্যায়ের সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিং করার মতো পর্যাপ্ত লোকবল নেই। এখন থেকে রাজউক নিরলসভাবে কাজ করবে। রাজউকের বিদ্যমান চর্চা আগুন লাগলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে রাজউক নড়েচড়ে বসে। তোড়জোড় করে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। এছাড়া কেউ যদি অভিযোগ দেয়, তখন তারা কাজ শুরু করে। এখন আমরা মানুষকে বুঝিয়ে কাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে আমরা এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে ভূতের গলির সড়কও বড় করছি। মানুষকে বোঝানো গেলে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট লাগে না।
ড্যাপ সংশোধন নিয়ে বলেছেন, ড্যাপ সংশোধন বিষয়ে কাজ চলছে। এখানে অনেক পক্ষ জড়িত; সবাইকে সন্তুষ্ট করা যাবে না। এটার সঙ্গে জমির মালিক, ডেভেলপার, আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, প্ল্যানার জড়িত। অনেকগুলো স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত। অনেকের ইগোরও বিষয় জড়িত রয়েছে। সবাইকে এক জায়গায় এনে সমাধানের চেষ্টা চলছে। কাজটি খুব সহজ না।
