ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রণীত গোপনীয়তা আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে দেশটির ২১টি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছেন ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমও। তাদের অভিযোগ, এই আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং সাংবাদিকদের তথ্যের উৎস শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে।
ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কথা বলে গত বছর আইনটি কার্যকরের উদ্যোগ নেয় মোদি সরকার। এর ফলে মেটা ও গুগলের মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের ওপরও নতুন নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আইনটিতে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ ছাড় না থাকায় তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিএনপিএ) সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এক গোপন নথিতে বলেছে, সরকার গত আগস্টে এক বৈঠকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার আশ্বাস দিলেও সাংবাদিকদের জন্য লিখিতভাবে কোনো ছাড়ের ব্যবস্থা করেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যে এ ধরনের সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর করা মামলাটি মঙ্গলবার শুনানির জন্য ওঠার কথা। মোদি সরকারের গোপনীয়তা আইনের বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত চ্যালেঞ্জ। এর আগে বাক্স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা কয়েকজন অধিকারকর্মী এবং কয়েকটি ছোট সংবাদমাধ্যম আইনটির বিরুদ্ধে আদালতে গিয়েছিল।
আম্বানি ও আদানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের এই আইনি পদক্ষেপকে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর বিরল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, এই দুই ব্যবসায়ী মোদির ঘনিষ্ঠ এবং সরকার তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়। তবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের বিতর্কিত অধিকাংশ বিধান বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এসব বিধান ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তাদের আশঙ্কা, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান শুরুর আগে সাংবাদিকদের তার সম্মতি নিতে হতে পারে। আবার কেউ সম্মতি প্রত্যাহার করে নিজের তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানালে সংবাদমাধ্যমকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সরিয়ে নিতে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিতে বাধ্য করা হতে পারে।
ডিএনপিএর ৬৯৮ পৃষ্ঠার নথিতে বলা হয়েছে, এই আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। সংগঠনটির মতে, আইনের কিছু বিধান গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং এগুলো আগাম সেন্সরশিপের সুযোগ তৈরি করে।
সম্মতি নেওয়ার বিধান নিয়ে উদ্বেগ
ডিএনপিএর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, আদানির এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান টাইমস ইন্টারনেট।
সংগঠনটির আশঙ্কা, অনুসন্ধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগে জানিয়ে তার সম্মতি নিতে হলে তিনি প্রমাণ নষ্ট করতে বা সাক্ষীদের ভয় দেখাতে পারেন। এ ছাড়া সম্মতি প্রত্যাহার করে তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানালে জনস্বার্থে প্রকাশিত সত্য সংবাদও সরিয়ে ফেলতে হতে পারে।
তথ্যের উৎস ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা
আইন অনুযায়ী, নিয়ম না মানলে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমকে জরিমানা করতে পারবে। পাশাপাশি জনস্বার্থের কথা বলে সরকার যেকোনো তথ্য চেয়ে পাঠাতে পারবে বা সেই তথ্যের নাগাল বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারবে। সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, এসব ক্ষমতা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
মামলার সঙ্গে যুক্ত আগস্টের এক চিঠিতে ডিএনপিএ অভিযোগ করে, ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে ব্যাপক ছাড় দিলেও সংবাদমাধ্যমের জন্য সমতুল্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি।
সংগঠনটির আশঙ্কা, আগামী বছর থেকে সরকার ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করা যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে নির্দেশ দিতে পারবে। এতে সাংবাদিকদের তথ্যের গোপনীয় উৎস প্রকাশের ঝুঁকি তৈরি হবে। দুর্নীতি, করপোরেট অনিয়ম কিংবা নির্বাচনী কারচুপির তথ্য ফাঁস করতে আগ্রহী ব্যক্তিরাও এতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
এদিকে, ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমেছে বলে অভিযোগ করে আসছেন সমালোচকেরা। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে চলতি বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম, যা ২০১৪ সালে ছিল ১৪০তম। তবে ভারত সরকার এই সূচকের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দেশটির সংবাদমাধ্যমের বিস্তৃত ও প্রাণবন্ত পরিবেশ রয়েছে এবং এ বিষয়ে বিদেশি সংস্থার স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই।
সূত্র: রয়টার্স
