ডেস্ক রিপোর্ট।
২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:০১ পিএম
জমি কেনার আগে কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বর নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন অনেকে। তিনটি বিষয়ই জমি শনাক্ত ও রেকর্ড যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এগুলোর কাজ এক নয়। কোনটি দিয়ে জমির মালিকানা-সংশ্লিষ্ট তথ্য জানা যায়, কোনটি রেকর্ডের অনুলিপি আর কোনটি দিয়ে জমির অবস্থান শনাক্ত করা হয়, তা জানা জরুরি।
শুধু একটি খতিয়ান বা পর্চা দেখে জমির মালিকানা, সীমানা কিংবা বিক্রেতার অধিকার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। জমির দলিল, সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, নামজারি, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি মিলিয়ে যাচাই করলে জমির পরিচয় ও স্বত্ব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়।
খতিয়ান কী, এতে কী তথ্য থাকে?
খতিয়ান হলো ভূমি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত করা স্বত্বলিপি বা রেকর্ড অব রাইটস। এতে নির্দিষ্ট জমি বা জমির অংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালিক বা স্বত্বসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম এবং জমির বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে।
একটি খতিয়ানে সাধারণত খতিয়ান নম্বর, মৌজার পরিচয়, মালিকের নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও শ্রেণি এবং একাধিক মালিক থাকলে তাদের অংশের বিবরণ পাওয়া যায়। জরিপের ধরন ও রেকর্ড প্রস্তুতের সময় অনুযায়ী তথ্যের বিন্যাসে পার্থক্য হতে পারে।
জমির রেকর্ডে কার নাম রয়েছে, কোন দাগে কতটুকু জমি উল্লেখ আছে এবং একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কার কত অংশ দেখানো হয়েছে, তা যাচাই করতে খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ। তবে খতিয়ান নিজে মালিকানা হস্তান্তরের দলিল নয়। এতে কারও নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। দলিল, উত্তরাধিকারসূত্রে স্বত্ব অর্জনের নথি ও অন্যান্য প্রমাণও যাচাই করতে হয়।
পর্চা কী, খতিয়ানের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
পর্চা বলতে সাধারণত খতিয়ানের অনুলিপি বা কপিকে বোঝানো হয়। ভূমি জরিপের সময় প্রস্তুত করা খসড়া রেকর্ডের যে কপি মালিককে যাচাইয়ের জন্য দেওয়া হয়, সেটিকে মাঠ পর্চা বলা হয়। অন্যদিকে, চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের অনুলিপিকেও পর্চা বলা হয়ে থাকে।
অর্থাৎ, খতিয়ান ও পর্চা সব সময় দুটি আলাদা নথি নয়। খতিয়ান হলো ভূমির রেকর্ড, আর পর্চা সাধারণত সেই রেকর্ডের অনুলিপি বা নির্দিষ্ট জরিপপর্যায়ে সরবরাহ করা কপি।
জমির রেকর্ডের তথ্য সংরক্ষণ, কেনাবেচার আগে তথ্য যাচাই এবং সরকারি ভূমিসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে পর্চা কাজে লাগে। তবে পর্চাটি কোন জরিপের, সেটি খসড়া নাকি চূড়ান্ত রেকর্ডের কপি এবং সত্যায়িত কি না, তা খেয়াল করা জরুরি।
দাগ নম্বর কী, এর কাজ কী?
জরিপের সময় একটি মৌজার জমিকে পৃথক পৃথক ভূমিখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব ভূমিখণ্ডকে শনাক্ত করার জন্য মৌজা নকশায় যে নম্বর দেওয়া হয়, সেটিই দাগ নম্বর।
সহজভাবে বললে, খতিয়ান থেকে জমির রেকর্ড ও স্বত্বসংশ্লিষ্ট তথ্য জানা যায়, আর দাগ নম্বরের সাহায্যে মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির অবস্থান ও সীমানা শনাক্ত করা যায়।
তবে শুধু দাগ নম্বর জানলেই জমির মালিকের নাম, বর্তমান স্বত্ব কিংবা বিক্রেতার আইনগত অধিকার নিশ্চিত হওয়া যায় না। এসব তথ্যের জন্য খতিয়ান, দলিল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি দেখতে হয়।
একই জমির দাগ নম্বর কি বদলাতে পারে?
হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে নতুন জরিপ হলে পুরোনো দাগ নম্বরের সঙ্গে নতুন দাগ নম্বরের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। জমি বিভক্ত হওয়া, একাধিক ভূমিখণ্ড একত্র করা কিংবা জরিপের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে দাগ নম্বরে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
তাই পুরোনো দলিলের দাগ নম্বরের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের নম্বর না মিললেই জমিটি আলাদা, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট মৌজা, জরিপের ধরন, সাবেক ও হাল দাগের সম্পর্ক এবং মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখতে হবে।
CS, SA, RS ও BS খতিয়ান কী?
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ভূমি জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এসব জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা খতিয়ানকে সাধারণভাবে CS, SA, RS ও BS খতিয়ান নামে চেনা হয়।
CS খতিয়ান: ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা প্রাথমিক ক্যাডাস্ট্রাল জরিপের রেকর্ড।
SA খতিয়ান: স্টেট অ্যাকুইজিশন-সংক্রান্ত রেকর্ড, যা জমিদারি অধিগ্রহণ-পরবর্তী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
RS খতিয়ান: রিভিশনাল সার্ভে বা সংশোধনী জরিপের রেকর্ড।
BS খতিয়ান: বাংলাদেশ সার্ভে নামে পরিচিত জরিপের রেকর্ড।
একটি জমির ক্ষেত্রে একাধিক জরিপের খতিয়ান থাকতে পারে। পরবর্তী জরিপে আগের রেকর্ডের তথ্য সংশোধিত বা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু খতিয়ানের নাম দেখে কোনটি চূড়ান্তভাবে সঠিক, তা নির্ধারণ করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার জরিপের অবস্থা, চূড়ান্ত প্রকাশনার তথ্য, দলিল ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করতে হবে।
জমি কেনার আগে কী কী যাচাই করবেন?
জমি কেনার সময় শুধু বিক্রেতার দেওয়া পর্চা বা খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।
প্রথমে দলিলে উল্লেখ করা মৌজার নাম, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জেএল নম্বর, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি মিলিয়ে দেখুন। এরপর সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ডে কার নাম রয়েছে, জমির পরিমাণ কত এবং বিক্রেতার দাবির সঙ্গে তথ্যের মিল আছে কি না যাচাই করুন।
একাধিক মালিক থাকলে বিক্রেতা ঠিক কতটুকু জমি বিক্রি করার অধিকার রাখেন, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, আগের দলিলগুলো কী বলছে এবং পরবর্তী কোনো হস্তান্তর হয়েছে কি না, সেসব নথিও পরীক্ষা করতে হবে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার ও বণ্টনসংক্রান্ত কাগজপত্র প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
এ ছাড়া মৌজা নকশা ও সরেজমিনের জমির অবস্থান, আয়তন এবং সীমানা মিলিয়ে দেখা জরুরি। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ারের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের নথিও যাচাই করতে হবে। তবে নামজারি বা কর পরিশোধের কাগজ একা মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
অনলাইনে খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্য কোথায় পাবেন?
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি পোর্টাল settlement.gov.bd-এ খতিয়ান অনুসন্ধান ও মৌজা ম্যাপ দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে চলমান জরিপের খসড়া রেকর্ডও দেখা যেতে পারে। এসব রেকর্ড জরিপের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি ভূমি রেকর্ড সেবা ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজন হলে সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে খতিয়ানের কপি বা সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা যায়। অনলাইনে তথ্য দেখা আর সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা এক বিষয় নয়।
খতিয়ানে নাম থাকলেই কি জমির মালিক হওয়া যায়?
খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভূমি রেকর্ড। তবে এতে নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। জমির মালিকানা যাচাইয়ে দলিল, স্বত্ব অর্জনের ইতিহাস, উত্তরাধিকার বা হস্তান্তরের কাগজপত্র, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা করতে হয়।
কোনো রেকর্ডে ভুল, বিরোধ বা একাধিক দাবিদার থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কিংবা ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।