মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন সাবেক মডেল ও মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউল। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের এক প্রতিবেদনে এই অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের প্লাজ়া হোটেলে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় কিউল যৌন হেনস্থার শিকার হন এবং পরে তাঁকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন। তবে হোয়াইট হাউস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা। এতে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের অপরাধ এবং তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের কথিত যোগসূত্র নিয়ে তদন্তের বিবরণ রয়েছে। প্রতিবেদনে কিউলসহ পাঁচ নারীর বক্তব্যের সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে, যাঁরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ অথবা যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের কমিটির কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে একাধিক দফায় সাক্ষাৎকারে কিউল জানান, তাঁর বয়স যখন ২৪ বছর, তখন নিউইয়র্কের প্লাজ়া হোটেলে এক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সে সময় হোটেলটির মালিক ছিলেন ট্রাম্প।
কিউলের দাবি, ট্রাম্প তাঁকে ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার দেখাশোনা করব।’ কিউলের অভিযোগ, ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথন শেষ হওয়ার পরপরই এপস্টিন তাঁর কাছে আসেন। নিজেকে ট্রাম্পের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এপস্টিন তাঁকে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মার-আ-লাগো ক্লাবে একটি পার্টিতে আমন্ত্রণ জানান। এপস্টিন নাকি বলেছিলেন, ‘আমরা ডনের সঙ্গে অনেক পার্টির আয়োজন করি।’
ট্রাম্পের দাবি, এপস্টিনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সন্দেহ তৈরি হওয়ার বহু আগেই তিনি তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। ট্রাম্প বারবার এপস্টিনকে ‘বিকৃত রুচির মানুষ’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং দাবি করেছেন, তাঁকে মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের এক প্রতিনিধি কিউলকে প্লাজ়া হোটেলের উপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানান। কিউলের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঘরে প্রবেশের পর ট্রাম্প পিছন থেকে তাঁকে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ সময় তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তক্ষরণ ও কালশিটে দাগ তৈরি হয়। কিউল ঘটনাটিকে ‘নিষ্ঠুর’ বলে বর্ণনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিউলের অভিযোগ অনুযায়ী, কথিত যৌন নির্যাতনের পর ট্রাম্প তাঁকে বিছানার কিনারায় বসান এবং আবারও ভিসা ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তাঁকে চুপ থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেন। প্রতিবেদনে ট্রাম্পের কথিত বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘অনুষ্ঠান চলতেই হবে।’
২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রথমবার প্রকাশ্যে অভিযোগ করার সময় কিউল বলেছিলেন, ১৯৯৩ সালে প্লাজ়া হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে যৌন হেনস্থা করেছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইলকে তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি আমার ঠোঁটে ও ঘাড়ে চুমু খেয়েছিলেন। আমার পোশাক তোলার চেষ্টা করেছিলেন। যতটা সম্ভব, আমার শরীরের সর্বত্র হাত দিয়ে ধরেছিলেন ও স্পর্শ করেছিলেন।’
তবে সে সময় কিউল দাবি করেছিলেন, ঘটনাটি আরও দূর এগোয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি বলেছিলাম, ‘আগে কথা বলি’ বা এ রকম কিছু। তারপর তিনি ধীর হয়ে যান।’ ছয় ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার সাবেক এই মডেলের বক্তব্য ছিল, তাঁর শারীরিক উচ্চতাই সম্ভবত তাঁকে কথিত যৌন আক্রমণ আরও গুরুতর হওয়া থেকে ‘বাঁচিয়েছিল।’
দ্য ডেইলি মেইল আরও জানিয়েছিল, কিউলের এক দীর্ঘদিনের বন্ধু দাবি করেছিলেন, প্রায় ২০ বছর আগেই কিউল তাঁকে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের কথা প্রথম জানিয়েছিলেন। ওই বন্ধুর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী বছরগুলিতে কিউল ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করেননি।
অভিযোগ অস্বীকার হোয়াইট হাউসের
২০২৪ সালে কিউলের অভিযোগ সামনে আসার সময় ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট সেগুলিকে ‘ভুয়া’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কেও হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, এপস্টিন-সংক্রান্ত কোনও বিষয়েই ট্রাম্পকে দায়ী করা যায় না এবং তিনি এ বিষয়ে ‘সম্পূর্ণভাবে অভিযোগমুক্ত’ হয়েছেন।
মুখপাত্র বলেন, ‘এই তথাকথিত প্রতিবেদনটি উন্মত্ত ডেমোক্র্যাটদের একটি মরিয়া প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক সাফল্যের জেরে রিপাবলিকানদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তি থেকে মার্কিন নাগরিকদের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপে রিপাবলিকানরা
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ এবং সেগুলি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি রিপাবলিকান প্রার্থীদের রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তবে এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ নির্বাচনী লড়াইয়ে রিপাবলিকানদের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগগুলি ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনে উত্থাপিত দাবি। এগুলিকে আদালতে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। হোয়াইট হাউস অভিযোগগুলি অস্বীকার করেছে।
