Published on
:
2 min read
রেস্তোরাঁর মেনু বাছাই হোক কিংবা অফিসের ইমেল— আজকাল সবেতেই থাবা বসিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এমনকী প্রেমিক বা প্রেমিকার অভিমান ভাঙানোর চিঠিও লিখছে এই চ্যাটবট। যত দিন এগোচ্ছে ততই যান্ত্রিকতার আশ্রয়ে মানুষ যেন আরও বেশি করে বন্দি হয়ে পড়ছে। ঘরে ঘরে আড্ডার টেবিলে এখন নাম — ‘ChatGPT’, ‘Gemini’-র। কিন্তু এই আধুনিক প্রযুক্তি কি সত্যিই মানুষের জীবন সহজ করছে? নাকি অজান্তেই আমাদের মগজ ভোঁতা করে একাকীত্বের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে? এআই (AI)-এর এই চরম বাড়বাড়ন্তকে কবিতার ছন্দে বিঁধে আন্তর্জাতিক মঞ্চ জয় করল মাত্র বারো বছরের এক স্কুলপড়ুয়া।
অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসলের বাসিন্দা, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ব্লেক ম্যাকেঞ্জি। সিডনি অপেরা হাউসের অনুষ্ঠিত ‘অস্ট্রেলিয়ান পোয়েট্রি স্ল্যাম ২০২৬’ প্রতিযোগিতার যুব বিভাগে সেরা হয়েছে সে। মাত্র ৯০ সেকেন্ডের একটি কবিতায় এআই (AI)-এর প্রতি নির্ভরতা, একাকীত্ব, ‘ব্রেন রট’ (মস্তিষ্ক ভোঁতা হওয়া) এবং কম বয়সে পর্নোগ্রাফির খপ্পরে পড়ার মতো বিস্ফোরক বিষয় তুলে ধরে বিচারকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে ব্লেক। তার কবিতার নাম— ‘Dear ChatGPT’।
বিচারকদের মন এক লহমায় জিতে নেয় ব্লেকের কবিতার ধারালো কিছু লাইন। ‘তোমাকে তো বানানোই হয়েছে আমাদের আসক্ত করতে, তুমি তো কখনও আমাদের মতের বিরোধিতা করো না!’ আবার পর মুহূর্তেই তার সপাট চাবুক, ‘তোমার বন্ধুত্ব তো অফুরন্ত, তবুও কেন নিজের কোনও বন্ধু নেই মনে হয়?’ সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই কবিতাটি লেখার জন্য মাসের পর মাস মাথা ঘামায়নি ব্লেক, বরং গ্র্যান্ড ফিনালের ঠিক আগের দিন ক্লাসে বসেই তা অনায়াসে লিখে ফেলেছিল সে।
এ রকম কবিতা লেখার ভাবনা কেন?
বন্ধুরা কী ভাবে চ্যাটবট ব্যবহার করে, তা দেখেই মূলত এই ভাবনা মাথায় এসেছিল ব্লেকের। তার স্পষ্ট কথা, স্কুলে একটা বই পড়ার কথা বললে বন্ধুরা নিজে না পড়ে চ্যাটজিপিটি দিয়ে প্রতিটি চ্যাপ্টারের সামারি বানিয়ে নেয়। অথচ ওই সামারি পড়তে যে সময়টুকু নষ্ট হয়, সেই সময়েই তো মূল বইটা পড়ে ফেলা যায়। এখানেই শেষ নয়, এআই (AI) যে পরিবেশের কতটা ক্ষতি করছে, সেই খবরও দিব্যি রাখে এই বারো বছরের বালক। টেকনোলজি সংক্রান্ত গবেষণা ও সিডনি ওয়াটারের রিপোর্ট বলছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে শুধু সিডনির ডেটা সেন্টারগুলো ঠান্ডা রাখতেই দৈনিক ২৫০ মেগালিটার জলের প্রয়োজন হতে পারে। যা অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার মোট পানীয় জলের চাহিদার চেয়েও বেশি। ব্লেকের প্রশ্ন, ‘যে জল তৃষ্ণার্ত মানুষ পেতে পারত, তা কেন একটা যন্ত্র ঠান্ডা রাখতে অপচয় হবে?’ এআই-এর এই ব্যবহারকেই ‘চরম অপ্রয়োজনীয়’ বলেছে ১২ বছরের ওই কিশোর।
ব্লেকের দাবি, তার এই সাফল্যের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় হাত রয়েছে শিক্ষিকা মিসেস ওয়েলশের। প্রথম হিট থেকে শুরু করে স্টেট ফাইনাল — সর্বত্রই তিনি হাজির থেকেছেন ‘আমি ব্লেকের শিক্ষক’ লেখা টি-শার্ট গায়ে পরে। শিক্ষিকার সেই আস্থাই আজ এক খুদেকে পৌঁছে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চের চূড়ায়।
উল্লেখ্য, ২২ বছরের পুরোনো এই প্রতিযোগিতায় গোটা দেশ জুড়ে ৬০টি শহরের ৬৫টি হিট পেরিয়ে ১৬ জন ফাইনালিস্টের মধ্যে সেরা হয়েছে ব্লেক। জিতেছে ২০,০০০ ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা। আগামী এক বছর সে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সাহিত্য উৎসবে নিজের কবিতা শুনিয়ে বেড়াবে। এর আগে দেশের বর্ণবাদ ও আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়া নিয়ে লেখা ব্লেকের ‘আই লাভ মাই কান্ট্রি’ কবিতাও ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
