রঞ্জি ট্রফিতে মিজ়োরামের হয়ে ৪০০ রানের ইনিংস খেলে ভারতীয় ক্রিকেটে আলোচনায় উঠে এসেছেন চিন্ময় সুতার। আদতে মুম্বইয়ের ক্রিকেটার তিনি। তাঁর দাদু, কাকা ক্রিকেট খেলতেন। বাবা রাজেশ সুতার ছিলেন সচিন তেন্ডুলকরের সতীর্থ। রাজেশের আগ্রাসী ব্যাটিং থেকে ছাড় পাননি শেন ওয়ার্নের মতো বোলারও।
জীবনের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেণির ম্যাচেই নজির গড়েছেন চিন্ময়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের প্রাক্তন অধিনায়ক ব্রায়ান লারা ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪০০ রান করেছিলেন। তাঁর পর চিন্ময়ই প্রথম ব্যাটার, যিনি এক ইনিংসে ৪০০ রান করলেন। চিন্ময়ের সাফল্যের এই পথ সহজ ছিল না। প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও মুম্বইয়ের হয়ে কখনও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাননি। অল্প কয়েকটি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন। বার বার সুযোগ না পেয়ে এই মরসুমে মিজ়োরামের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম ম্যাচে মণিপুরের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে ১ রানের জন্য শতরান পূর্ণ করতে পারেননি চিন্ময়। আউট হয়ে যান ৯৯ রান করে। প্রথম ইনিংসে করেন ৩৫ রান। শতরান হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ দ্বিতীয় ম্যাচেই সুদে-আসলে পূরণ করেছেন। মজার তথ্য হল, লাল বলের ক্রিকেটে এটাই চিন্ময়ের প্রথম শতরান।
১৯৪৮ সালে মহারাষ্ট্রের হয়ে কাঠিওয়ারের বিরুদ্ধে ৪৪৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন বিবি নিম্বলকর। তার পর গত ৭৮ বছরে আর কোনও ক্রিকেটার ভারতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪০০ রানের ইনিংস খেলতে পারেননি। দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে নজির গড়েছেন চিন্ময়। এমন সাফল্যের পর একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন চিন্ময়। বাড়ির ক্রিকেট পরিবেশ, নিজের ক্রিকেটজীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। ৪০০ রানের ইনিংস নিয়ে চিন্ময় বলেছেন, ‘‘শুরুতে বল সুইং করছিল। প্রথম এক ঘণ্টা সাবধানে খেলার চেষ্টা করেছি। আমার লক্ষ্য ছিল, দলের জন্য যত বেশি সম্ভব রান করা। শতরান পূর্ণ হওয়ার পর স্বস্তি পেয়েছিলাম। আগের ম্যাচে ১ রানের জন্য শতরান হয়নি। ২০০ বা ৩০০ করার কথা ভাবিনি। মাথায় ছিল, যতক্ষণ সম্ভব ব্যাট করতে হবে। রান করতে হবে। ২০০ রানে পৌঁছোনোর সময় দলের সাত উইকেট পড়ে গিয়েছিল। তখন শুধু রান বাড়ানোর চেষ্টা করেছি।’’ শেষ উইকেটে লালরেমপুঁইয়াকে নিয়ে চিন্ময় যোগ করেছিলেন ১৮৯ রান। তাঁর ৪০০ পূর্ণ হওয়ার পর ডিক্লেয়ার করে দেয় মিজ়োরাম। দু’দলের ক্রিকেটারেরা উঠে দাঁড়িয়ে চিন্ময়কে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেছেন, ‘‘৩৫০ রানে আমাদের ৮ উইকেট পড়ে যায়। তখন মনে হয়েছিল, অন্তত ৪৫০ রান তুলতে হবে আমাদের। শেষের দিকের ব্যাটারদের সঙ্গে কথা বলে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। রান করার দায়িত্ব আমিই নিয়েছিলাম। ওদের বলেছিলাম, উইকেট ধরে রাখতে। ২০-২৫ রান করে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছি।’’ কখন মনে হল নজির গড়তে চলেছেন? চিন্ময় বলেছেন, ‘‘৩৮০ করার পর মনে হল কিছু একটা হতে পারে। সাজঘরে সতীর্থদের উচ্ছ্বাস দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রতিপক্ষ দলের ক্রিকেটারেরাও আলোচনা করছিল।’’
৪০০ রানের ইনিংস খেলার পর বাবাকে ফোন করেন চিন্ময়। মুম্বইয়ের হয়ে সাতটি রঞ্জি ম্যাচ খেলেছিলেন রাজেশ। ছক্কা মারার দক্ষতার জন্য মুম্বইয়ের ক্রিকেট মহলে পরিচিত ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সালে স্টিভ ওয়ের নেতৃত্বে ভারত সফরে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া। মুম্বইয়ে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিলেন তাঁরা। সেই ম্যাচে সচিনের সঙ্গে ব্যাট করছিলেন রাজেশ। ওয়ার্নের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মেজাজে ব্যাট করেন তিনি। সচিন-রাজেশ জুটি ১৫ ওভারে ৯৭ রান যোগ করেন। রাজেশ করেছিলেন ৪৩ বলে ৪৫। সেই ম্যাচে সচিন করেছিলেন অপরাজিত ২০৪। এমনই ক্রিকেটীয় পরিবেশে বড় হয়েছেন চিন্ময়। রাজেশ মুম্বইয়ের হয়ে রঞ্জি খেলার সুযোগ পেলেও চিন্ময় পাননি।
মুম্বইয়ে ক্রিকেট প্রতিভার অভাব কোনও দিনই নেই। রঞ্জি দলে ঢোকার লড়াই বেশ কঠিন। পারফরম্যান্সের উনিশ-বিশ পার্থক্যেও ক্রিকেটারেরা ছিটকে যান দল থেকে। চিন্ময়ও কঠিন প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারেননি। দাদু, বাবা, কাকাকে দেখেই ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয় চিন্ময়ের। ছোটবেলায় মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার উপকূলবর্তী শহর চিনচানিতে থাকতেন চিন্ময়। সেখানে বড় হয়েছিলেন তাঁর বাবাও। ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঠানেতে চলে আসেন চিন্ময়। মূলত সেখানেই তাঁর ক্রিকেট শেখা শুরু। শুরুতে ছিলেন লেগ স্পিনার। পরে স্কুল এবং ক্লাব পর্যায়ে খেলার সময় ব্যাটিংয়ে মন দেন। চিন্ময়ের আদর্শ ছিলেন ওয়ার্ন। অনূর্ধ্ব-২৩ মুম্বই দলের অধিনায়ক হয়েছেন। ২০১৯ সালে ইন্ডিয়া এমার্জিং দলের হয়ে হংকংয়ের বিরুদ্ধে শতরান করেন। ২০২৫ সালে মুম্বই প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ রান করার পরেও মুম্বইয়ের রঞ্জি দলে জায়গা পাননি। ২৯ বছরের চিন্ময় বলেছেন, ‘‘ওই পারফরম্যান্সের পরও মুম্বই দলে জায়গা না পাওয়ায় অন্য দলের হয়ে খেলার কথা ভাবি। মিজ়োরাম আমায় সুযোগ দিয়েছে। সুযোগটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি।’’
মিজ়োরাম যখন প্রস্তাব দেয়, সে সময় ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলছিলেন। ট্রায়ালে যোগ দিলেও সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত ছিল না। তাই ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে মিজ়োরামের ট্রায়ালে যোগ দিতে আগ্রহ পাননি। বাবা রাজেশের পরামর্শে ট্রায়ালে যোগ দেন। এক দিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন। ট্রায়ালের পর আবার ইংল্যান্ড ফিরে যান। দু’সপ্তাহ পর চিন্ময় জানতে পারেন, তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
মুম্বইয়ে থাকার সময় অভিষেক নায়ার, সিদ্ধেশ লাডদের কাছে প্রচুর সাহায্য পেয়েছেন। পরামর্শ পেয়েছেন। ভারতীয় ক্রিকেটে নজির গড়ার পরও তাঁদের সেই সাহায্য, পরামর্শের কথা মনে রেখেছেন চিন্ময়। সুযোগ পেলে কি মুম্বইয়ের হয়ে খেলবেন? চিন্ময় বলেছেন, ‘‘বলা সম্ভব নয়। আমি বর্তমান নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চাই না।’’ কিছুটা অভিমানী শুনিয়েছে চিন্ময়ের গলা।
