আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বের সমরাস্ত্র বাজারে পশ্চিমের দেশগুলো, রাশিয়া কিংবা চিনের একাধিপত্যকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি ও যৌথ উৎপাদনের এক নতুন সামরিক জোট গড়ে তুলতে হাত মেলাল চার মুসলিম দেশ—তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও কাতার। কাতারের রাজধানী দোহায় দেশ চারটির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘বদর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি’ (Badr Defence Cooperation Pact)। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য কোনও পারস্পরিক আত্মরক্ষামূলক অক্ষ তৈরি করা নয়, বরং নিজেদের সামরিক ও শিল্প সক্ষমতাকে একত্রিত করে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি ‘ইসলামিক মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা, যাকে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সামরিক হার্ডওয়্যারের এক বিকল্প ‘হালাল স্ট্যান্ডার্ড’ তৈরির রূপরেখা হিসেবে দেখছেন।
চুক্তিবদ্ধ চারটি দেশই সামরিক দিক থেকে প্রভাবশালী হলেও যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও ট্যাঙ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের জন্য তারা এতদিন বিদেশি শক্তির ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল ছিল। পাকিস্তানের বিমানবাহিনী যেমন মূলত আমেরিকা ও চিনের যুদ্ধবিমানের ওপর দাঁড়িয়ে এবং তাদের নিজস্ব জেএফ-১৭ বিমান তৈরির ইঞ্জিন বা এভিওনিক্সের জন্যও বেজিংয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। ইন্দোনেশিয়া তাদের বিমানবাহিনীর জন্য মার্কিন এফ-১৬, রুশ সুখোই ও ফরাসি রাফালের মতো ভিন্ন ভিন্ন দেশের মডেল ব্যবহার করে। কাতারের বিপুল অর্থভাণ্ডার থাকলেও তাদের কোনও দেশীয় সামরিক উৎপাদন ব্যবস্থা নেই। এমনকি তুরস্কে উন্নত প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তারা ন্যাটোর প্রযুক্তির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অতীতে রাশিয়ার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র কেনার কারণে আঙ্কারাকে মার্কিন এফ-৩৫ প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া কিংবা জাকার্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের অভিজ্ঞতা এই চার দেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বিপদের সময়ে বিদেশি অস্ত্র সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটেই বদর চুক্তিকে এক বিশেষ ‘কোয়াড’ কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট সুবিধাকে কাজে লাগানো হবে। কাতারের রয়েছে বিপুল মূলধনের জোগান, পাকিস্তানের রয়েছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (কামরা) ও করাচি শিপইয়ার্ডের মতো সামরিক পরিকাঠামো, ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতি, আর তুরস্কের রয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রমাণিত উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা শিল্প ও ড্রোন প্রযুক্তি। অতীতেও এই দেশগুলোর মধ্যে যৌথ প্রকল্প গড়ে উঠেছিল—যেমন তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার তৈরি ‘হারিমাউ’ ট্যাঙ্ক, তুরস্কের মিলগেম নকশায় পাকিস্তানে তৈরি ‘বাবর’ করভেট যুদ্ধজাহাজ কিংবা পাকিস্তানের কেনা তুর্কি ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ ড্রোন।
তবে এই নতুন চুক্তির আওতায় সবচেয়ে বড় নজর এখন তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN)-এর ওপর। ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং পাকিস্তানও যুক্ত হতে চায়। এমন মেগা প্রকল্পে কাতারের আর্থিক বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। স্থল, জল ও আকাশপথের অস্ত্র উৎপাদনে চারটি দেশের প্রযুক্তি, কারখানা এবং পুঁজির এই মিলন সফল হলে আগামী দিনে সৌদি আরব কিংবা মিশরের মতো দেশগুলোও এতে যোগ দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যের চিরাচরিত সমীকরণ ভেঙে এই চার দেশীয় অক্ষ কতটা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে, আগামী দিনে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সেদিকেই কড়া নজর রাখবেন।
