বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে হঠাৎ করেই যেন তৈরি হয়েছে নতুন এক আবহ! সাদা পোশাকে মাঠে নামলেই এখন আলোচনায় আসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। একসময় যে সংস্করণে ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগতে হতো বাংলাদেশকে, সেই টেস্টেই এখন সাফল্যের হিসাব কষছে দল। কিন্তু সাফল্যের এই সময়ে দাঁড়িয়েও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর চোখে তৃপ্তির ছাপ নেই। বরং তার ভাবনায় আরও ভালো করার তাগিদ।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের আগে আজ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে রসিকতা করলেন শান্ত। টেস্ট ম্যাচ ঘিরে এত সাংবাদিকের আনাগোনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ চোখে পড়ছে তার। তবে এই বাড়তি আগ্রহকে সাফল্যের চূড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবে দেখতে নারাজ বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার মতে, টেস্টে বাংলাদেশের উন্নতির পথ এখনো অনেক বাকি।
গত এক বছরে আট টেস্ট খেলে পাঁচটিতে জয়, দুটিতে ড্র এবং মাত্র একটিতে হার-পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশের বদলে যাওয়ার গল্প। এই সময়ে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করেছেন শান্ত নিজে, মুশফিকুর রহিম ও তানজিদ হাসান তামিম। বল হাতে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। ব্যাটিং-বোলিং, দুই বিভাগেই সাফল্যের ছাপ রেখেছে বাংলাদেশ।
তবে এই সাফল্যকে হঠাৎ পাওয়া কোনো অর্জন হিসেবে দেখছেন না শান্ত। তার মতে, টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটির শুরু আরও আগে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা।
শান্তর কথায়, ‘ভালো লাগছে সবাই টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছেন। তবে আমার মতে যে সংস্কৃতির কথাটা বললেন, সেটা আরও দুই-তিন বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে। অনেক ভালো করার সুযোগ আছে। যেভাবে আসলে আমরা ক্রিকেটাররা চিন্তা করছি, আমরা ভালো করছি কিন্তু ক্রিকেটাররা এখনো খুশি না। আমাদের মতে এখান থেকে আরও উন্নতির জায়গা আছে।’
সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশকে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের স্বপ্নও দেখাচ্ছে। ৫৫.৫৬ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে ২০২৫-২৭ চক্রের পয়েন্ট টেবিলে এখন চতুর্থ স্থানে শান্তর দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজে ধবলধোলাই করতে পারলে সফলতার হার বেড়ে দাঁড়াবে ৬৬.৬৭ শতাংশে। তাতে ফাইনালের দৌড়ে অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সমীকরণটা বাংলাদেশের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চার টেস্ট জিততে পারলে ফাইনালের লড়াইয়ে ভালোভাবেই টিকে থাকবে দল। এর সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অন্তত একটি টেস্ট ড্র করতে পারলে সম্ভাবনা আরও বাড়বে। কিন্তু এত হিসাব-নিকাশের ভিড়েও শান্তর মাথায় আপাতত নেই ফাইনালের ভাবনা। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট নিয়েও এখনই ভাবতে চান না তিনি।
বাংলাদেশ অধিনায়ক বলছিলেন, ‘সত্যি বলতে কি একদমই ভাবিনি (ফাইনাল খেলতে কী করতে হবে, তা নিয়ে)। আমি শুধু এই টেস্টটা নিয়েই ভাবছি, এমনকি এই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টও ভাবনায় নেই।’
বড় স্বপ্ন পূরণের জন্য ছোট লক্ষ্য সামনে রাখার দর্শনেই এগোতে চায় বাংলাদেশ। শান্তর বিশ্বাস, প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের কাজ ঠিকভাবে করতে পারলে বড় অর্জনগুলো এমনিতেই ধরা দেবে। তাই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিল কিংবা ফাইনালের সমীকরণ নিয়ে বাড়তি ব্যস্ততা তৈরি করতে চান না তিনি। বরং মাঠের পারফরম্যান্স, প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়াকেই দিতে চান সর্বোচ্চ গুরুত্ব।
শান্ত বলেন, ‘দল হিসেবে আমরা সব সময় ভাবি, এই ম্যাচ বা সিরিজটা কীভাবে খেলব। এ ধরনের ম্যাচ বা সিরিজ জিততে পারলে আমাদের লক্ষ্যগুলো এমনিতেই পূরণ হয়ে যায়। তাই দল হিসেবে আমরা সব সময় ছোট ছোট লক্ষ্য নিয়ে ভাবি। গত কয়েক বছরেও আমরা এভাবেই এগিয়েছি।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পরই দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে দেশ ছাড়বে বাংলাদেশ দল। আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হবে দুই টেস্টের সিরিজ। এরপর আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে শেষ হবে এই চক্রে বাংলাদেশের টেস্ট অভিযান। ফলে সামনের এক মাস বাংলাদেশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভালো শুরু করতে পারলে পরের লড়াইগুলোতে আত্মবিশ্বাস নিয়ে নামতে পারবে দল।
তবে লক্ষ্য যত বড়ই হোক, সেটিকে বাড়তি চাপ হিসেবে নিতে চান না শান্ত। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং মাঠে শতভাগের বেশি দেওয়ার মানসিকতা, ‘চাপ ও চ্যালেঞ্জ সব সময়ই থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা এই বিষয়গুলো কীভাবে উপভোগ করছি, নিজেদের প্রক্রিয়া মেনে চলছি কি না এবং নিজেদের কাজগুলো ঠিকমতো করছি কি না। খেলোয়াড়েরা মাঠে নিজেদের ১২০ শতাংশ দিচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলো যদি আমরা ঠিকভাবে করতে পারি, তাহলে আমার বিশ্বাস, এই দুই ম্যাচে আমরা ভালো টেস্ট ক্রিকেট খেলব এবং ভালো একটি টেস্ট সিরিজ কাটাতে পারব।’
প্রস্তুতির প্রশ্নে অবশ্য বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকার কথা ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ক্যারিবীয়রা ঢাকায় এসে দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি এক সপ্তাহ ধরে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছে। বিপরীতে আরব আমিরাতের ত্রিদেশীয় সিরিজে ব্যস্ত থাকায় বাংলাদেশ দল একসঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছে মাত্র এক দিন। তবে এই সীমিত প্রস্তুতি নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন নন অধিনায়ক। তার মতে, প্রত্যেক ক্রিকেটার ব্যক্তিগতভাবে নিজের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে শান্তর বক্তব্য, ‘প্রস্তুতির দিক থেকে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। যতটুকু সময় পেয়েছি, প্রত্যেকে নিজের যে জায়গাগুলোতে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পেরেছে। প্রতিপক্ষ কেমন প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছি না। আমাদের প্রস্তুতি কতটা ভালো হয়েছে এবং আমরা কতটা ভালোভাবে তৈরি হয়ে ম্যাচটা খেলতে পারি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গা থেকে আমি খুশি।’
আগামীকাল বুধবার মিরপুরে শুরু হবে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথমটি। দ্বিতীয় টেস্ট শুরু ৮ নভেম্বর, সিলেটে। একদিকে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের হাতছানি, অন্যদিকে নিজেদের উন্নতির ক্ষুধা-দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।
