ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রান-অফে ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৯টার কিছু পর ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৬ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি ভোটার। অন্যদিকে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলসোনারো। তাকে ভোট দিয়েছেন ৫ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি ভোটার। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৪০ লাখেরও বেশি।
অক্টোবরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়েছিলেন লুলা। গত ৪ অক্টোবরের ওই ভোটে লুলা পান ৪৫ শতাংশ ভোট, বলসোনারো পান ৪৭ শতাংশ। কোনো প্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় নির্বাচন রান-অফে গড়ায়। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে লুলা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও রোববারের চূড়ান্ত পর্বে তিনি কিছুটা পিছিয়ে থাকা অবস্থায় লড়াইয়ে নেমেছিলেন।
আধুনিক ব্রাজিলের ইতিহাসে আর কোনো রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্বে হেরে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় জয়ী হতে পারেননি। লুলা সেটি করে দেখালেন।
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান এদিনিয়ো সিলভা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।’ পোস্টের সঙ্গে তিনি একটি ভিডিও দেন, যেখানে সমর্থকদের ‘ওলে, ওলে, ওলে, ওলে, ওলা! লুলা, লুলা!’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
ভোটের দিন কিছু এলাকায় গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার খবর সামনে আসার পর ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। লুলার সমর্থকদের অভিযোগ, বলসোনারোর সমর্থকরা বাস চলাচল কমিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে প্রেসিডেন্টের সমর্থক শ্রমিক-শ্রেণির ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারেন। এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বলসোনারোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এর আগে লুলা ও বলসোনারো উভয়ের নির্বাচনী প্রচারশিবির ভোট দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। পরে দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা বেশি খোলা রাখা হয়। ব্রাসিলিয়া সময় সন্ধ্যা ৭টা (জিএমটি রাত ১০টা) পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।
ধাতুশ্রমিকদের সাবেক ইউনিয়ন নেতা ৮০ বছর বয়সী লুলা ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফেরার পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশি বয়সে শপথ নেওয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেরই রেকর্ড ভাঙবেন তিনি।
১৯৮০-র দশকে, অর্থাৎ ব্রাজিলে সামরিক স্বৈরশাসনের শেষ পর্যায়ে রাজনীতিতে আসেন লুলা। এ পর্যন্ত সাতবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি। ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২২ সালে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হন, যা ছিল আধুনিক ব্রাজিলের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কট্টর ডানপন্থি সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারো। এবারের প্রতিপক্ষ সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো জায়ার বলসোনারোরই সন্তান।
লুলার এই জয়ের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকছেন তিনি। অন্যদিকে অঞ্চলটির ডানপন্থি রাজনৈতিক শিবির গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে জয় থেকে বঞ্চিত হলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেরু, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি নেতারা জয়লাভ করেছেন। তাদের অনেকেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনমনে থাকা অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন। সূত্র: আল জাজিরা
বিআলো/শিলি