রাজধানীর প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী দখল ও দূষণে যখন অস্তিত্বের সংকটে, তখন নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। ঢাকার শ্যামপুর ও কদমতলী থানার আইলবহর মৌজার তিনটি দাগের জমির ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি পরিবর্তন করে ‘ওপেন স্পেস’ থেকে শর্তসাপেক্ষে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সংশোধনী এনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল শিল্প ও গোডাউন স্থানান্তরের পথ সুগম করতেই এ উদ্যোগ। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, শিল্পায়নের আড়ালে বুড়িগঙ্গার দূষণ বাড়ার পাশাপাশি নদীর তীর দখলের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের দখল-দূষণে বিপর্যস্ত নদীটির সুরক্ষা নিশ্চিত না করে তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলে তা পরিবেশের জন্য নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে। অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) দাবি, পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের অগ্নিঝুঁকি থেকে রক্ষা এবং কেমিক্যাল শিল্প স্থানান্তরের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিগত কয়েক দশকে দখল দূষণে মৃত প্রায় বুড়িগঙ্গার কপালে শেষ পেরেক বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শ্যামপুর ও কদমতলী থানার আইলবহর মৌজার ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন করে
ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সংশোধন আনা হয়েছে। ড্যাপের সংশোধনীতে আইলবহর মৌজার মহানগর ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ দাগের প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহার ‘ওপেন স্পেস’ থেকে পরিবর্তন করে শর্ত সাপেক্ষে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে শেষ কফিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খাল, জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। তারা নদীর সীমানা নির্ধারণে যে পিলার স্থাপন করেছিল সেটিও ছিল নদী দখলের একটা সুযোগ। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে নদী রক্ষার উদ্যোগ না নিয়ে এভাবে ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন করে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্প এলাকা ঘোষণা করলে নদী আর থাকবে না। এটা ঢাকা মহানগরের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে। তবে এ জায়গাটি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের মালিকানাধীন। তাই তারা কোনো ধরনের শিল্প স্থাপনে অনুমতি দেবে সেটা তাদের এখতিয়ার। শিল্প কারখানা স্থাপনের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের আবেদন করলেই কেবল পরিবেশগত বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে বলে মনে করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
ইতোমধ্যে সেখানে ৫৪টি কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে বলে জানিয়েছে বিসিআইসি। তাই সেখানে নতুন করে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটা করা হলে পুরান ঢাকার নিরাপত্তা বাড়বে।
বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. সাইদুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, যে জায়গার কথা বলা হয়েছে সেখানে ইতোমধ্যে ৫৪টি কেমিক্যাল গোডাউন আছে। পুরান ঢাকার কেমিক্যাল শিল্পগুলো সেখানে স্থাপনের জন্য এটা করা হয়েছে। পরিবেশের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এত দিন কী কারণে রাজউক ওপেন স্পেস রেখেছিল সেটা আমাদের জানা নেই। পুরান ঢাকার নিরাপত্তার জন্য এটা করা হয়েছে।
বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে ভারী শিল্পের অনুমতি দিলে সেখানে নদীদূষণ হবে। পাশাপাশি আশাপাশে যারা অবৈধ দখলদার রয়েছে তারাও সুযোগ বুঝে নদীর পাড় দখল করে শিল্প কারখানা করতে যাবে।
এ বিষয়ে ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্সের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) সদস্য সচিব শরীফ জামিল আমাদের সময়কে বলেন, বিগত সময়ে খাল নদী দখল হয়েছে। বর্তমান সরকার নদীর অবৈধ দখলদারদের বৈধতা দেওয়া এবং নতুন করে দখলের সুযোগ দিতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে। এটা হবে বুড়িগঙ্গার বুকে শেষ কফিন।
গত ১৪ অক্টোবর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এখতিয়ারাধীন এলাকার মাস্টার প্ল্যান (ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা) ড্যাপের সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই সংশোধনীতে শর্তসাপেক্ষে ওপেন স্পেস থেকে ভারী শিল্প এলাকায় রূপান্তর করা যাবে।
কী কারণে সংশোধন আনা হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, এটা নতুন কোনো শিল্প এলাকা না। বিগত ৫০ বছর যাবৎ এ জায়গা ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বা শিল্পাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। পুরান ঢাকার ৫০ লাখ লোককে আগুনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার এবং বিসিআইসি।
তবে কোন ধরনের শিল্প করলে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে? সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু করার আছে কিনা? জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র) মাসুদ ইকবাল মো. শামীম আমাদের সময়কে বলেন, উক্ত জায়গা বিসিআইসির প্লট। এটা বহু পুরনো। আগে থেকে কোনো জরিপ করার এখতিয়ার পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই। ওখানে কী ধরনের শিল্প করবে তারা যখন আবেদন করবে তখন খতিয়ে দেখা হবে পরিবেশ দূষণ হবে কিনা, এসব যাচাই বাছাই করেই ছাড়পত্র দেওয়া হবে। কাজেই যখন আবেদন আসবে তখন বলা যাবে কী হবে না হবে।
শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, আবেদন করা ভূমি বুড়িগঙ্গা নদীর ‘ফোর শোর’ সংলগ্ন হওয়ায় অভ্যন্তরীণ জলপথ ও তীরভূমিতে স্থাপনাদি নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে।
এ ছাড়া প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছ থেকেও অনাপত্তি বা মতামত গ্রহণ করতে হবে। সিটি জরিপ রেকর্ডের পর্চায় ‘হালট’ শ্রেণি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তা সংরক্ষণ করতে হবে এবং নির্মাণ করা সব ভবনে সংশ্লিষ্ট বিধি ও কোড অনুসরণ করে রাজউক থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে ড্যাপের অনুমোদনযোগ্য ভূমি ব্যবহার এবং জলস্রোত ওভারলে জোনের নির্দেশনার মধ্যে কোনো ভিন্নতা বা সাংঘর্ষিক অবস্থা দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গেজেটে বলা হয়েছে, সরকারি খাসজমি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি (পর্চায় উল্লিখিত খাল, ক্যানেল, পুকুর, রাস্তা বা চলার পথ, জলাশয় ইত্যাদি) ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে জলস্রোত ওভারলে জোনের নির্দেশনার পরিবর্তে ড্যাপের প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহার নির্দেশনা অনুযায়ী অকুপেন্সি টাইপ নির্ধারিত হবে।
এ ছাড়া অনুমোদিত আবাসিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনুমোদিত লে-আউটের ভূমি ব্যবহারের নির্দেশনার আলোকে এটি নির্ধারিত হবে।
রাজউক থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) শিল্প প্লট ছিল। কিন্তু এত দিন ওপেন স্পেস থাকার কারণে সেখানে কোনো কিছু করা যাচ্ছিল না। তাই সংশোধন এনে সেটাকে শিল্প অঞ্চলে রূপান্তর করা হচ্ছে।
এটা বাস্তবায়িত হলে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল শিল্প সেখানে স্থানান্তর সহজ হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের শামনামলে নারায়ণগঞ্জের গজারিয়া কেমিক্যাল পল্লী স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়ে সেখানে শিল্প প্লট করা হয়েছিল। কিন্তু পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা সেখানে যেতে অনাগ্রহী। তাই এবার শ্যামপুর ও কদমতলী থানার আইলবহর মৌজায় ২ একর জায়গার ওপর গড়তে চায় শিল্পাঞ্চল।
নির্দিষ্ট জমিতে ভারী শিল্পের সুযোগ : আইলবহর মৌজার মহানগর জরিপের ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগের জমি ড্যাপে প্রস্তাবিত ‘ওপেন স্পেস’ থেকে শর্তসাপেক্ষে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ হিসেবে পরিবর্তনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
