মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কাছে হার মানতে বসেছে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার রানিগঞ্জ আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যে বিদ্যালয়টি মাত্র এক বছর আগে এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে রোদ-বৃষ্টির চরম দুর্ভোগের কারণে চলতি বছর পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৪০ শতাংশে। একটি পাকা ভবনের অভাবে বিদ্যালয়টির প্রায় ২০০ কোমলমতি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন আজ চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে।
সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায় ২০০১ সালে জহুরুল হকের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যন্ত এলাকার এই বাতিঘরটির অবকাঠামোগত তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। দীর্ঘদিনের পুরোনো টিনের লম্বা ঘরটিতে চলছে পাঠদান। সংস্কারের অভাবে চালে মরিচা ধরে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। চালের সেই ফুটো দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আকাশ দেখা যায়।
ভারী বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষ তলিয়ে যায়। ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও বেঞ্চ। অন্যদিকে গ্রীষ্মের প্রখর রোদে টিনের তাপে শ্রেণিকক্ষ যেন অগ্নিকু-ে পরিণত হয়। ভ্যাপসা গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয় শিক্ষার্থীরা, অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া কালবৈশাখী বা ঝড়-বৃষ্টির দিনে জরাজীর্ণ এই কাঠামো যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আতঙ্কে দিন কাটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের।
নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র রায়হান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘গত বছর আমাদের স্কুল উপজেলায় ফার্স্ট হয়েছিল। আর এবার চালের ফুটো দিয়ে পড়া বৃষ্টির পানিতে আমাদের স্বপ্নগুলো ভিজে নষ্ট হয়ে গেল। টিনের গরমে যখন মাথা ঘোরে আর দম বন্ধ হয়ে আসে, তখন মাঝে মাঝে মনে হয় পড়াশোনাই ছেড়ে দিই!’
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিবি খাদিজা আক্ষেপ করে বলে, ‘বৃষ্টি শুরু হলে চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। তখন বই-খাতা বাঁচাব নাকি নিজেরা বসব, সেই জায়গা থাকে না। ঠিকমতো ক্লাসই যদি না হয়, সিলেবাস শেষ না হয়, তাহলে আমরা ভালো রেজাল্ট করব কীভাবে?’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোকেয়া বেগম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মেধার কোনো ঘাটতি নেই, গত বছরের রেজাল্টই তার বড় প্রমাণ। কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায়। মেঘ দেখলেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এমন ভয়ংকর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঠিকমতো পাঠদান করতে না পারার কারণেই এবারের ফলে এত বড় বিপর্যয় ঘটেছে।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির গত বছরের ফল সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল। অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এবারের ফল খারাপ হয়েছে বলে জেনেছি। আমরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে নতুন ভবনের চাহিদাপত্র পাঠাব।
ইউএনও মনোরঞ্জন বর্মণ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এত প্রতিকূলতার মাঝেও গত বছর তাদের সাফল্য প্রমাণ করে সেখানে শিক্ষার মান ভালো। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোরালো সুপারিশ পাঠানো হবে।’