সর্বশেষ আপডেট:
স্টার অনলাইন ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
একটি ছোট্ট বীজ থেকে চারা গজাচ্ছে, গাছে ফুটছে নতুন ফুল; এ দৃশ্য মন ভালো করে দেয়। কিন্তু গাছের যত্ন নেওয়ার আনন্দ কেবল মনের ভালো লাগাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা বলছে, মাটি খোঁড়া, গাছে পানি দেওয়া কিংবা শুকনো পাতা ছাঁটার মতো সাধারণ কাজ শরীরকে সচল রাখে, কমাতে পারে মানসিক চাপ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত বাগান করার সঙ্গে ভালো ঘুম, ভালো স্মৃতিশক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের সম্পর্কের যোগসূত্র আছে। অর্থাৎ, বাগান কেবল শখের কাজ নয়, সুস্থ থাকারও সহজ উপায়।

শরীরচর্চা হয়, কমে মানসিক চাপ
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাছ লাগানো, মাটি খোঁড়া, টব সরানো কিংবা শুকনো ডাল ছাঁটার সময় শরীরের নানা পেশি কাজ করে। হৃদস্পন্দনও বাড়ে। ফলে বাগান করা শরীরকে সক্রিয় রাখার একটি উপায় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসক ও কোয়েন মেডিক্যালের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিউ কোয়েনের মতে, বাগান করার সময় দীর্ঘক্ষণ ধরে হালকা শারীরিক পরিশ্রম হয়। এতে হৃদযন্ত্রের উপকার হয়। হাত দিয়ে একই ধরনের কাজ বারবার করাও মানসিক চাপ কমে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ও প্ল্যান্ট উইজডম প্রজেক্টের প্রতিষ্ঠাতা মেরিয়ন ওবারহুবার বলেন, প্রকৃতির সংস্পর্শ শরীরের বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে। গাছের রং দেখা, পাখির ডাক শোনা, পাতা ও মাটি ছোঁয়া এবং প্রাকৃতিক গন্ধ নেওয়ার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করে একাধিক ইন্দ্রিয়। এতে মন শান্ত হয়।

ভালো ঘুমেও ভূমিকা রাখতে পারে
২০২৫ সালে বায়োইনফরমেশন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গুজরাটের ৫০ জন বয়স্ক ব্যক্তির ওপর বাগানভিত্তিক থেরাপির প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। ছয় সপ্তাহের এই কার্যক্রমের পর তাদের ঘুমের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।
স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষক মিয়া সোভিয়েরো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে বলেন, দীর্ঘদিন মানসিক চাপের কারণে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেশি থাকলে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। এতে শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কিন্তু বাগান করলে কারো কারো এই সমস্যার সমাধান হয়।

স্মৃতিশক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যে উপকার
২০২৪ সালে পাবলিক হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় চীনের ৮ হাজার ৬৭৬ জন বয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখেছেন, যারা নিয়মিত বা প্রায় প্রতিদিন বাগানের কাজ করতেন, তাদের মধ্যে বাগানের কাজ না করা ব্যক্তিদের তুলনায় ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ২৮ শতাংশ কম ছিল। ডিমেনশিয়ায় মূলত স্মৃতি ও চিন্তাভাবনার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগান করার সঙ্গে মানসিক সুস্থতারও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ৪০টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাগান করা ও বাগানভিত্তিক থেরাপি মানসিক সুস্থতা এবং জীবনযাপনের মান উন্নত করতে পারে। তবে গবেষণাগুলোর পদ্ধতি ও ফলাফলে পার্থক্য ছিল।
কোয়েনের মতে, গাছের যত্ন নেওয়া এবং তাতে নতুন ফুল ফুটতে দেখা মানুষকে আনন্দিত করে। এটি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ মোকাবিলায় বেশ সহায়ক হয়।

মাটির সঙ্গে যোগাযোগেও কি উপকার আছে
গাছ ও মাটির সংস্পর্শে আসার সম্ভাব্য উপকার নিয়েও গবেষণা চলছে। মাটিতে থাকা কিছু অণুজীব শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি ছোট পরীক্ষায় নির্দিষ্ট একধরনের ব্যাকটেরিয়াযুক্ত মাটি হাতে নেওয়ার পর অংশগ্রহণকারীদের রক্তে সেরোটোনিনের মাত্রা বেড়েছিল। সেরোটোনিন মেজাজ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাসায়নিক। তবে সাধারণ বাগানের মাটি ধরলেই একই ফল পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে গবেষণা হয়নি। রক্তে সেরোটোনিন বাড়ার অর্থ মস্তিষ্কেও এর মাত্রা বেড়েছে তা নয়।

দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্নাল অব এনভায়রনমেন্ট সাইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ৪৭৫ জন বয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২৫ বছরের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা দেখেছেন, যারা নিয়মিত বাগান করতেন তাদের মৃত্যুঝুঁকি ২২ শতাংশ কম ছিল (বাগান খুব কম করেন বা করেন না এমন ব্যক্তিদের তুলনায়)। তাদের টেলোমিয়ারও তুলনামূলক দীর্ঘ ছিল। টেলোমিয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা সুরক্ষামূলক অংশ, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত ছোট হয়।
