ভীতি ও শঙ্কার রাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন
পিরোজপুর সদর উপজেলা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে চিতলিয়া গ্রাম। গত শনিবার গভীর রাতে এখানেই এক অকল্পনীয় শঙ্কা ও ভয়ের আবহে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা.........
বাংলাদেশ
প্রতিনিধিপিরোজপুর সদর উপজেলা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে চিতলিয়া গ্রাম। গত শনিবার গভীর রাতে এখানেই এক অকল্পনীয় শঙ্কা ও ভয়ের আবহে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া এই মুক্তিযোদ্ধার দাফন নিয়ে চরম উত্তেজনা ও হুমকি-ধমকির ঘটনা ঘটে, যা তাঁর স্বজন ও এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
গত ৫ আগস্টের পর থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মানিক পশারী। অসুস্থতার পর গত শনিবার সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর শনিবার দুপুরে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদরে আনা হলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে শুরু করে।
পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাঁর মরদেহ এলাকায় দাফন করতে বাধা দেন। এমনকি চিতলিয়া গ্রামের পারিবারিক গোরস্থানে আগে থেকে খুঁড়ে রাখা কবরটি ভরাট করে দেওয়া হয়।
স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, শিবিরের সাবেক নেতা মুইন উদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন দেশীয় অস্ত্রসহ সেখানে গিয়ে কবর ভরাট করে দেন এবং গালাগাল করেন। পাশাপাশি, ‘মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুরের মাটিতে হবে না’ বা ‘পুড়িয়ে দাও’ স্লোগান দিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।
হুমকি ও উত্তেজনার কারণে চিতলিয়া গ্রামের বাড়িতে নির্ধারিত জানাজা পণ্ড হয়ে যায় এবং উপস্থিত লোকজন নিরাপত্তার ভয়ে সরে যান। বাধ্য হয়ে শনিবার দুপুরে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখানে জানাজায় আপনজন বলতে কেবল তাঁর মেয়ের জামাতা মো. ফারুক উপস্থিত ছিলেন। ফারুক জানান, পরিবারের অন্য কোনো সদস্য জানাজা পড়তে পারেননি।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর শনিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে পুলিশ প্রশাসন মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেয়। তবে হুমকির ভয়ে গ্রামবাসী বা প্রতিবেশীদের কেউই কবর খুঁড়তে আসেননি। অনন্যোপায় হয়ে মানিক পশারীর তিন বোন-হেনা, রিনা ও আরেক বোন নিজেরা মাটি তুলতে শুরু করেন। পরে এক প্রতিবেশী ও একজন গ্রাম পুলিশের সহায়তায় কবরটি খোঁড়া সম্পন্ন হয় এবং রাত দেড়টার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
এই নজিরবিহীন ঘটনার পর মানিক পশারীর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এর আগে গত ৫ আগস্টের পর তাঁর বসতবাড়ি ও দোকান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পাঁচ মাস আগে ক্যানসারে একমাত্র ছেলেকে হারানো এই পরিবারটি এখন নতুন করে শোক পালনেরও সুযোগ পাচ্ছে না।
মানিক পশারীর বোন হেনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাদের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল যে, লাশ পুড়িয়ে ফেলা হবে এবং পরিবারের কাউকে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হবে না। এই ভীতির কারণে মানিক পশারীর পুত্রবধূ রাতেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
এ বিষয়ে জেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতারা সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি না হলেও, এর আগে সেক্রেটারি জহিরুল হক দাবি করেছিলেন যে দাফনে তাদের কোনো বাধা বা সহযোগিতাও ছিল না।
অন্যদিকে, পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. শরিফুল ইসলাম আশ্বাস দিয়েছেন, পরিবার অভিযোগ করলে তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ