অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পুলিশ পিছপা হবে নাÑ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের সম্ভাবনা উসকে দেওয়া এ বক্তব্যকে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থি বলে আখ্যা দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। রাজনৈতিক দল ও নাগরিক পরিসর থেকেও উঠেছে প্রতিবাদের আওয়াজ। এমনকি সরকারের অনুমতি থাকলেও বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না বলে প্রশ্ন তুলেছেন
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তীব্র সমালোচনার মুখে এবার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। তাদের দাবি, আইন প্রয়োগে কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন; বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
এর আগে পুলিশ কঠোর হলে বলা হয় ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’, আবার নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন ফকির। গতকাল সোমবার রাজধানীর চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকা- থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে সাংবাদিকদের একাংশের সমালোচনা করে আইজিপি বলেন, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ চললেও অনেকে এ বিষয়ে কিছু বলেন না। সেখান থেকে টাকা না পেলে তারা লেখেন, বাংলাদেশে পুলিশ অকার্যকর হয়ে গেছে।
এদিকে আইজিপির এমন বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে এ বক্তব্য। আইজিপির এ বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ। এ বিষয়ে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, আইজিপির প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানাচ্ছে টিআইবি। সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নিন্দা ও উদ্বেগ জানায় টিআইবি।
‘ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার তাগিদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম ও সুদের কুফল নিয়ে আইজিপি বলেন, ইসলামে সুদ ও ঘুষ সম্পূর্ণ হারাম। প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং হতে হবে সম্পূর্ণ সুদমুক্ত, যেখানে থাকবে অংশীদারত্ব (পার্টনারশিপ), নৈতিকতা এবং ফেয়ার বিজনেস বা স্বচ্ছ জবাবদিহিতা। অতীতে ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন অনিয়ম, ব্যাংক দখল এবং উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ও মনিটরিং ঠিক না থাকলে যতই আইন থাকুক না কেন, তা কার্যকর হবে না। গ্রাহক ও বাস্তবায়নকারী উভয় পক্ষকেই নৈতিকতার জায়গায় থাকতে হবে। বর্তমান ম্যানেজমেন্টের অধীনে গ্রাহকদের সম্পূর্ণ আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো অনিয়ম বা বিপর্যয় এখন আর ঘটার সুযোগ নেই। পাশাপাশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মনিটরিং আরও জোরদার করার ওপর জোর দেন তিনি।
পুলিশকে অকার্যকর করার চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়ে আইজিপি বলেন, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। পুলিশ সদস্যদের কেউ অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমাদেরও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স রয়েছে। কিন্তু কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া বা পুলিশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা হলে সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। পুলিশকে এমপাওয়ার না করলে এবং আইন প্রয়োগের সুযোগ না দিলে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গুজব ও মিথ্যা প্রচারণায় কান না দিয়ে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।
আইজিপি অভিযোগ করে বলেন, ১৭ বছর ধরে যারা নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে অকার্যকর করেছে, তাদের আমলেই পাড়ায়-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে। তৎকালীন সরকারি দলের নেতারা মাদক থেকে মাসোহারা পেতেন এবং পুলিশেরও কিছু সদস্য এতে জড়িত ছিলেন। তবে আমরা আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করছি। গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে।
?সম্প্রতি পুলিশের সমালোচনা করে দেওয়া নাগরিক সমাজের এক বিবৃতির প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, ১০১ জন নাগরিক বলছেন গোপনীয়তার কথা। আপনি কি পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতরে গোপনে গিয়ে মদ খাবেন, মাতলামি করবেন, কোকেন-হেরোইন গ্রহণ করবেন? সংবিধানের কোথায় লেখা আছে যে এসব আপনার অধিকার? স্বাধীনতা আছে বলে যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না, আইনের আওতায় থাকতে হবে।
পুলিশের যোগ্যতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে আইজিপি বলেন, আপনারা বলেন অশিক্ষিত পুলিশ নিয়োগ দেন, কনস্টেবলের আবার কি জ্ঞান লাগে? অথচ এই কনস্টেবলই তৃণমূল পর্যায়ে আপনাকে সেবা দিচ্ছে। ওর সঙ্গে ঝামেলা হলেই বলেন পুলিশ খারাপ। আবার নিয়োগের সময় বলেন শিক্ষিত লোকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু পুলিশেই সব থেকে বেশি শিক্ষিত লোক দরকার। কারণ তাকে সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে কন্ট্রোল করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফেল করলে রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের মারামারি হয়, ইন্ডাস্ট্রিতে বেতন না দিলে শ্রমিকের মারামারি হয় পুলিশের সঙ্গে। পুলিশকে অকার্যকর করে সব দায় পুলিশের ওপর চাপানো যাবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের ডিউটি করতে ভয় পাওয়ার যে পরিস্থিতি ছিল, সেখান থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধময় বাংলাদেশ গঠনের জন্য পুলিশ দিন-রাত কাজ করছে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, কোনো কিছু ঘটলে, যেমনÑ মাদক, সমাজে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- চললেও আপনারা অনেকে (সাংবাদিকরা) কোনো কিছু মনে করছেন না। সেখান থেকে গোপনে টাকা নিচ্ছেন। সাংবাদিক সাহেবরা যখন ওখান থেকে পয়সা না পাচ্ছেন তখন লিখছেন বাংলাদেশে পুলিশ অকার্যকর হয়ে গেছে। কেন? আমরা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করি নাই। আমরা কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করিনি। আপনারা দেখেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে পুলিশের যে অবস্থা ছিল, পুলিশ রাস্তায় ডিউটি করতে ভয় পেত, তারা যেতে সাহস পেত না।
‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালকরা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের শরী’আহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকদের জন্য আধুনিক বিকল্প ব্যাংকিং সুবিধা চালুর ক্ষেত্রে ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর এই যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? সরকারের অনুমতির শর্তজুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার পথ খোঁজা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। এ দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচার প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।
বিচারবহির্ভূত হত্যার অতীত ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দ- এবং মামলাটির রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারের প্রকাশিত অডিও ও হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তাদের দ- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ।
অতীতের এসব ঘটনার পরও পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আসায় প্রশ্ন তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, এর উত্তর পুলিশপ্রধানকেই দিতে হবে। পুলিশপ্রধানের এমন বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই সন্ত্রাস দমন সম্ভব। এর পরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতিসাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। সরকারের ঘোষিত অবস্থান বাস্তবায়নে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা-ও স্পষ্ট করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি বলেছে, পুলিশের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষায় কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য। এ সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগ প্রসঙ্গে টিআইবি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
এদিকে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মানুষকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিচ্ছেন অভিযোগ করে তার বিরুদ্ধে সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল রাজধানীর মুগদায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আইজিপি আলী হোসেন ফকির ডিবির হারুন ও বেনজীরের বংশধর, যার জন্য পুলিশ বাহিনীর সুনাম আবার ক্ষুণœ হচ্ছে। এই আইজিপি মানুষকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিচ্ছেন, তার বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে ধরে নেব আবার ক্রসফায়ার, গুম ও খুনের দিকে হাঁটছে সরকার। আইজিপির মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, পুলিশের কাপড় জনগণের টাকায় কেনা। আপনারা বিএনপির পুলিশ না, সালাহউদ্দিনের পুলিশ না। তাই আগামী নির্বাচনে তাদের হয়ে কাজ করার দরকার নেই, জনগণের হয়ে কাজ করুন।
আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক বিবৃতিতে বলেন, সরকারের অনুমোদন থাকলেই কোনো নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার অবশ্যই সংবিধান, আইন ও মানবাধিকারের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেন এবি পাটির দুই শীর্ষ নেতা।
পৃথক এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, আইজিপির ক্রসফায়ার নিয়ে যা বলেছেন তা উদ্বেগজনক। তার এই বক্তব্য পতিত ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আলী হোসেন ফকির হালকা মেজাজে এই মন্তব্য করেছেন। যদিও এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে হালকা মেজাজে মন্তব্য করা যায় না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বিবৃতিতে বলেন, আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল তুলে ধরার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের কথা বলা পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর হতে হবে, তবে সেই কঠোরতা অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আমরা আইজিপির বক্তব্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছি।
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য তাকে আল্টিমেটাম দিয়েছে দলটি।
এদিকে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সোমবার এক স্পষ্টীকরণে সদরদপ্তর জানিয়েছে, আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশে শব্দটি ব্যবহার করেননি বলেও দাবি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, আইজিপি তার বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ পুলিশ রাষ্ট্রের প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অপরাধ দমন, অপরাধী গ্রেপ্তার, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের কখনও অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী কিংবা আইন অমান্যকারী ব্যক্তিদের সরাসরি প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধী গ্রেপ্তার, অবৈধ কর্মকা- প্রতিরোধ এবং সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। দেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে দ-বিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা রয়েছে বলেও স্পষ্টীকরণে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ বিষয়ে স্পষ্টীকরণে বলা হয়, প্রকৃত অর্থে তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি, এটি অসাবধানতাবশত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশ পুলিশ মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
